
গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির।।
যুগের পর যুগ ধরে নানা ধরনের বিশ্বাস ও ধারণা মানুষের মধ্যে চলে আসছে। কিছু সামাজিক রীতিনীতি থেকে এসেছে, কিছু লোকমুখে প্রচলিত হয়েছে, আবার কিছু বিষয় ধর্মীয় বিশ্বাসের সঙ্গে মিশে গেছে। ফলে অনেক সময় মানুষ বুঝতেই পারে না কোনটি ধর্মের নির্দেশ আর কোনটি নিছক প্রচলিত ধারণা।কোনো কথা বহুদিন ধরে প্রচলিত আছে বলেই তা সত্য হয়ে যায় না। বিশেষ করে ধর্মীয় কোনো বিষয়ের ক্ষেত্রে কোরআন-সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য প্রমাণ রয়েছে কি না, তা যাচাই করে দেখা দরকার। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ বলেন, ‘যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। কান, চোখ, হৃদয় এদের প্রত্যেকটি সম্পর্কে কৈফিয়ত তলব করা হবে।’ (সুরা আল-ইসরা, আয়াত: ৩৬)কোনো কিছু শুনে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করা বা অন্যের কাছে প্রচার করার আগে বিষয়টি যাচাই করা আমাদের দায়িত্ব। প্রচলিত কিছু কুসংস্কার আমাদের সমাজে রয়েছে, যার কোনো নির্ভরযোগ্য ধর্মীয় ভিত্তি পাওয়া যায় না। যেমন- কবরের দিকে তাকানো বিষয়ে:কবরের দিকে আঙুল দিয়ে দেখালে সেই আঙুল মুখে দিয়ে কামড় দিতে হবে, নইলে অমঙ্গল হবে এ ধরনের ধারণার পক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো দলিল নেই। তা বিশ্বাস করা বা অন্যের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াও উচিত নয়।সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণের বিষয়ে ভুল ধারণা:অনেকের ধারণা, সূর্যগ্রহণ বা চন্দ্রগ্রহণের সময় গর্ভবতী নারী কোনো কিছু কাটাকাটি করলে গর্ভের সন্তান ক্ষতিগ্রস্ত বা বিকলাঙ্গ হতে পারে। এটিও প্রচলিত একটি কুসংস্কার। এর পক্ষে ইসলামি কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় তাঁর ছেলে ইব্রাহিম (রা.) ইন্তেকাল করার দিন সূর্যগ্রহণ হয়েছিল। তখন কিছু মানুষ মনে করেছিল, ইব্রাহিমের মৃত্যুর কারণেই সূর্যগ্রহণ হয়েছে। কিন্তু রাসুলুল্লাহ (সা.) স্পষ্ট করে দিয়েছিলেন যে, সূর্য ও চন্দ্র কারও মৃত্যু বা জন্মের কারণে গ্রহণ হয় না। গ্রহণ দেখা গেলে নামাজ ও দোয়ার প্রতি মনোযোগ দিতে বলেছেন। (সহীহ বুখারী: ১০৪৩)অতএব, চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণকে কারও জন্ম-মৃত্যু বা কোনো অমঙ্গলের সঙ্গে যুক্ত করাও ঠিক নয়।শারীরিক অবস্থাকে ঘিরে ভুল ধারণা:হায়েজ, নিফাস বা স্বপ্নদোষের মতো স্বাভাবিক শারীরিক অবস্থাকে ঘিরেও আমাদের সমাজে নানা ভুল ধারণা রয়েছে। কেউ কেউ মনে করেন, এ ধরনের অবস্থায় মানুষ স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারবে না, কারও সঙ্গে কথা বলা যাবে না কিংবা সাধারণ কাজকর্ম করা যাবে না। এসব ধারণাও সঠিক নয়।তবে,এ অবস্থাগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত কিছু নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিধান রয়েছে। সেগুলো জানতে হলে লোকমুখে প্রচলিত কথা অনুসরণ না করে কোরআন-সুন্নাহ এবং নির্ভরযোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যার ওপর নির্ভর করতে হবে।অন্যায় দেখেও নীরব থাকা:আমাদের মধ্যে অনেকেই মনে করেন, অন্যায় যে করেছে, সে তার ফল ভোগ করবে; তাই অন্যায় দেখলেও প্রতিবাদ করার দরকার নেই। যার যার কর্মফল সে সে ভোগ করবে। কিন্তু ইসলাম মানুষকে সৎকাজে উৎসাহিত করতে এবং অন্যায় থেকে বিরত রাখতে শিক্ষা দিয়েছে। তাই যথা সম্ভব অন্যায়কে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। অবশ্য অন্যায় প্রতিহত করার ক্ষেত্রেও জ্ঞান, সামর্থ্য ও পরিস্থিতি বিবেচনা করা জরুরি। এমন কোনো পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়, যার ফলে অন্যায়ের চেয়েও বড় ক্ষতি তৈরি হয়। নিজের সাধ্য অনুযায়ী ভালো কাজে সহযোগিতা করা এবং অন্যায় থেকে মানুষকে সতর্ক করাই হোক আমাদের উদ্দেশ্য।খাবার ও দৈনন্দিন ঘটনাকে ঘিরে কুসংস্কার:কেউ কেউ মনে করেন, পরীক্ষার আগে ডিম খেলে পরীক্ষায় খারাপ ফল হয়। আবার কারও হাত থেকে থালা-বাসন পড়ে গেলে মনে করা হয়, বাড়িতে অতিথি আসবে। কোনো পাখি বিশেষভাবে ডাকলে মনে করা হয়, নিশ্চয়ই কোনো ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে। খাবার গলায় আটকে গেলে কেউ কেউ বলেন, নিশ্চয়ই কেউ তাকে নিয়ে কথা বলছে। এসব ধারণার কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। দৈনন্দিন জীবনের স্বাভাবিক ঘটনাকে অমঙ্গল, ভবিষ্যৎ বিপদ বা বিশেষ কোনো সংকেত হিসেবে ব্যাখ্যা করাও উচিত নয়। গ্রামবাংলায় আরও কিছু বিশ্বাস প্রচলিত আছে। যেমন, গরুর বাচ্চা হওয়ার পর গাভীর শরীর থেকে যে নির্দিষ্ট অংশ বের হয়, তার নাম নেওয়া যাবে না, এমন ধারণা। নাম নিলে অমঙ্গল হবে এ ধরনের বিশ্বাসেরও কোনো নির্ভরযোগ্য ভিত্তিই নেই।সন্তান জন্মকে ঘিরে কুসংস্কার:সন্তান জন্মের পর কোনো কোনো পরিবারে ঘরের দরজায় খেজুরপাতা, বরইয়ের ডাল বা অন্য কোনো বস্তু রাখা হয়, যাতে অশুভ কিছু ঘরে প্রবেশ করতে না পারে। এসব বস্তু নিজের ক্ষমতায় অশুভ কিছু ঠেকাতে পারে এমন বিশ্বাসের নির্ভরযোগ্য ভিত্তি নেই। আবার নবজাতকের কান্নাকে ঘিরেও সমাজে নানা ধরনের ব্যাখ্যা প্রচলিত রয়েছে। সহীহ বুখারীর একটি হাদিসে নবজাতকের জন্মের সময় শয়তানের স্পর্শের কারণে তার কান্নার কথা উল্লেখ হয়েছে। যেমন নিচের হাদিসে বর্ণিত হয়েছে- ‘আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)-কে বলতে শুনেছি, এমন কোনো আদম সন্তান নেই, যাকে জন্মের সময় শয়তান স্পর্শ করে না। জন্মের সময় শয়তানের স্পর্শের কারণেই সে চিৎকার করে কাঁদে। তবে মারইয়াম এবং তাঁর ছেলে (ঈসা) (আ.) এর ব্যতিক্রম। অতঃপর আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, “হে আল্লাহ! নিশ্চয়ই আমি আপনার নিকট তাঁর এবং তাঁর বংশধরদের জন্য বিতাড়িত শয়তান হতে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।’ (সহীহ বুখারী: ৩২৮৬, সহীহ মুসলিম: ২৩৬৬, মুসনাদে আহমাদ: ৭১৮৫)।তাই এ বিষয়ে হাদিসের বক্তব্যকে যথাযথভাবে গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে শিশুর জন্ম বা কান্নাকে ঘিরে সমাজে প্রচলিত অতিরঞ্জিত ও ভিত্তিহীন অমঙ্গলের গল্প তৈরি করা থেকেও বিরত থাকা প্রয়োজন।তাকদির বা ভাগ্য নিয়ে ভুল ধারণা:তাকদিরে বিশ্বাস ইসলামি আকিদার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কিন্তু তাকদির সম্পর্কে আমাদের সমাজে দুই ধরনের ভুল ধারণা দেখা যায়। কেউ মনে করেন, যেহেতু সবকিছু আগে থেকেই নির্ধারিত, তাই মানুষের কোনো চেষ্টা করার প্রয়োজন নেই। আবার কেউ তাকদিরকে অস্বীকার করে মনে করেন, মানুষের জীবন সম্পূর্ণ তার নিজের নিয়ন্ত্রণে। দুটির কোনোটিই সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি নয়।একজন মুসলিম আল্লাহর তাকদিরে বিশ্বাস করবে এবং একই সঙ্গে নিজের সাধ্য অনুযায়ী চেষ্টা করবে। মানুষ তার কাজের জন্য চেষ্টা করবে, সঠিক পথ বেছে নেবে এবং ফলাফল আল্লাহর ওপর ছেড়ে দেবে। তাই ‘সবকিছু ভাগ্যে লেখা আছে, চেষ্টা করে লাভ কী’ এমন চিন্তাও সঠিক নয়।লাইলাতুল কদর ও শাবানের মধ্যরাত:লাইলাতুল কদর ইসলামে অত্যন্ত মর্যাদাপূর্ণ একটি রাত। তবে শাবানের ১৫তম রাত, অর্থাৎ প্রচলিত শবে বরাতের বিশেষ মর্যাদা ও এ রাতে নির্দিষ্ট আমল নিয়ে আলেমদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।তাই এ বিষয়ে একটি মতকে সবার ওপর চূড়ান্তভাবে চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে মতভেদের বিষয়টি জানা দরকার। তবে রুটি-ফিরনি, বিশেষ খাবার বা কোনো নির্দিষ্ট সামাজিক রীতিকে ইসলামের বাধ্যতামূলক বিধান মনে করার নির্ভরযোগ্য কোনো ভিত্তি নেই। আর ধর্মীয় কোনো আমলকে অপরিহার্য মনে করার আগে আমাদেরকে অবশ্যই তার প্রমাণ যাচাই করা উচিত।কুসংস্কার ও বিদআত এক বিষয় নয়:কুসংস্কার ও বিদআত শব্দ দুটি অনেক সময় পাশাপাশি ব্যবহার করা হলেও দুটির অর্থ এক নয়।কুসংস্কার বলতে সাধারণত এমন ভিত্তিহীন বিশ্বাস বা ধারণাকে বোঝানো হয়, যার পেছনে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। আর বিদআত বলতে ধর্মীয় আমল বা ইবাদতের ক্ষেত্রে শরিয়তের স্বীকৃত পদ্ধতির বাইরে নতুন কিছু সংযোজনের বিষয় বোঝানো হয়। তাই কোনো বিষয়কে কুসংস্কার বা বিদআত বলার আগে তার প্রকৃতি ও ধর্মীয় অবস্থান ভালোভাবে বোঝা দরকার। বিশেষ করে ধর্মীয় বিষয়ে কাউকে বা কোনো কাজকে চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে আমাদেরকে সে বিষয়ে জ্ঞানার্জন ও সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।কুসংস্কার থেকে মুক্তির উপায়:কুসংস্কার থেকে মুক্ত থাকার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো সঠিক জ্ঞান অর্জন করা। কোনো কথা সমাজে প্রচলিত আছে বলেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়া উচিত নয়। আবার কোনো বিষয় অপরিচিত মনে হলেই সেটিকে কুসংস্কার বলে দেওয়াও ঠিক নয়।কোনো বিশ্বাস বা আমল গ্রহণ করার আগে দেখতে হবে এর নির্ভরযোগ্য ধর্মীয় ভিত্তি আছে কি না, কোরআন ও সহিহ হাদিসে এর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় কি না এবং বিষয়টি নির্ভরযোগ্য আলেমদের ব্যাখ্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। ধর্মীয় কোনো কথা শোনামাত্রই তা অন্যের কাছে প্রচার না করে যাচাই করা উচিত। কারণ একটি ভুল কথা একজনের কাছ থেকে আরেকজনের কাছে যেতে যেতে একসময় সমাজের প্রচলিত বিশ্বাসে পরিণত হয়ে যায়। আমাদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, প্রচলিত হওয়া আর সত্য হওয়া এক বিষয় নয়। কোনো বিশ্বাস বহু বছর ধরে চলে আসলেও তার সত্যতা যাচাই করা দরকার। একইভাবে কোনো বিষয় সম্পর্কে যথেষ্ট জ্ঞান না থাকলে তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া থেকেও বিরত থাকা উচিত।সংক্ষিপ্ত কথা:কুসংস্কার শুধু একটি ভুল বিশ্বাস নয়। অনেক সময় এটি মানুষের চিন্তা, আচরণ ও ধর্মীয় জীবনকেও প্রভাবিত করে। তাই কুসংস্কার থেকে মুক্ত থাকতে হলে অন্ধ অনুসরণের পরিবর্তে জ্ঞান, সচেতনতা ও যাচাইয়ের অভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। সর্বোপরি আমাদেরকে জ্ঞানার্জন করতে হবে। আসুন, আমরা ভিত্তিহীন বিশ্বাস ও অন্ধ অনুকরণের পরিবর্তে, কোরআন-সুন্নাহর নির্ভরযোগ্য শিক্ষা, সঠিক জ্ঞান, বিবেক ও যুক্তিবোধকে গুরুত্ব দিই। নিজেদের কুসংস্কার থেকে মুক্ত রাখি এবং অন্যদেরও ভুল ধারণা থেকে সচেতন করি। মহান আল্লাহ আমাদের সত্যকে সত্য হিসেবে চিনে তা অনুসরণ করার এবং মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বিশ্বাস থেকে দূরে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।