
তাপস চন্দ্র সরকার, কুমিল্লা।।
কুমিল্লা: “জয় জগন্নাথ… জয় জগন্নাথ…”—হাজারো কণ্ঠের এই ধ্বনি, শঙ্খধ্বনি, উলুধ্বনি, ঘণ্টা-করতাল এবং মহাহরিনাম সংকীর্তনের সুরে বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) মুখর হয়ে ওঠে কুমিল্লা নগরী। সুসজ্জিত রথ, ফুলে সজ্জিত মন্দির প্রাঙ্গণ এবং হাজারো ভক্তের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে শ্রীশ্রী জগন্নাথ, বলদেব ও সুভদ্রাদেবীর পবিত্র রথযাত্রা মহোৎসব।
কুমিল্লার জগন্নাথপুর শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের মন্দির এবং দক্ষিণ ঠাকুরপাড়াস্থ শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণ গৌর-নিতাই মন্দিরভিত্তিক আন্তর্জাতিক কৃষ্ণভাবনামৃত সংঘ (ইসকন), কুমিল্লার যৌথ উদ্যোগে দিনব্যাপী পূজার্চনা, ধর্মসভা, মহাহরিনাম সংকীর্তন, ভজন-কীর্তন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং মহাপ্রসাদ বিতরণের মধ্য দিয়ে মহোৎসব পালিত হয়। ভোর থেকেই জগন্নাথপুর শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের মন্দিরে ভক্তদের সমাগম শুরু হয়। সকাল ৭টায় মঙ্গল আরতির মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কর্মসূচির সূচনা হয়। এরপর পূজার্চনা, জগন্নাথদেবের দর্শন, বিশ্বশান্তি কামনায় অগ্নিহোত্র যজ্ঞ, পদাবলী কীর্তন, ভজন এবং মহাহরিনাম সংকীর্তনে মুখর হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ। শিশু থেকে প্রবীণ—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতিতে মন্দির এলাকা পরিণত হয় এক ভক্তিময় মিলনমেলায়। দেশ, জাতি ও বিশ্বমানবতার শান্তি ও কল্যাণ কামনায় অনুষ্ঠিত হয় বিশেষ প্রার্থনা।
দুপুরে হাজারো ভক্ত ও দর্শনার্থীর মধ্যে মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয়। ধর্ম, বর্ণ ও সামাজিক পরিচয়ের ভেদাভেদ ভুলে সবাই একই সারিতে বসে প্রসাদ গ্রহণ করেন। উপস্থিত ভক্তরা বলেন, রথযাত্রার অন্যতম শিক্ষা হলো—ভগবানের কাছে সবাই সমান। এই আয়োজন সমাজে মানবিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সাম্য ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেয়।
ধর্মসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী আমিন উর রশিদ ইয়াছিন। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন কুমিল্লা জেলা প্রশাসক মিজ রোজী আক্তার, পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান পিপিএম (সেবা), আদর্শ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা তুজ জোহরা, কুমিল্লা সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক ইউসূফ মোল্লা টিপু, কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান উৎবাতুল বারী আবু এবং কুমিল্লা দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আশিকুর রহমান মাহমুদ ওয়াসিম প্রমুখ। অনুষ্ঠানে শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন- বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্ট, কুমিল্লা মহানগর শাখার আহ্বায়ক শ্রী শ্যামলকৃষ্ণ সাহা এবং সমাজসেবক সুমন সাহা। স্বাগত বক্তব্য দেন- ইসকন, কুমিল্লার সহ-সভাপতি শ্রীমান ভদ্র নিমাই দাস ব্রহ্মচারী। উদ্বোধনী শ্রীমদ্ভগবদ্গীতা পাঠ করেন- শ্রীমান সদা শিব সিংহ দাস ব্রহ্মচারী এবং সভাপতিত্ব করেন শ্রীমান সুদর্শন জগন্নাথ দাস ব্রহ্মচারী।
বক্তারা বলেন, রথযাত্রা শুধু ধর্মীয় উৎসব নয়; এটি ভালোবাসা, নৈতিকতা, সহমর্মিতা, মানবিকতা এবং সামাজিক সম্প্রীতির এক অনন্য প্রতীক। বিভাজনের পরিবর্তে ঐক্য ও মানবকল্যাণের শিক্ষা সমাজের সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
ধর্মসভা শেষে জগন্নাথপুর শ্রীশ্রী জগন্নাথদেবের মন্দির থেকে রাজগঞ্জ হয়ে দক্ষিণ ঠাকুরপাড়ার শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণ গৌর-নিতাই মন্দির পর্যন্ত বের হয় বর্ণাঢ্য রথযাত্রা।
হাজারো ভক্ত করতাল, মৃদঙ্গ ও কীর্তনের তালে অংশ নেন শোভাযাত্রায়। “হরে কৃষ্ণ, হরে রাম” এবং “জয় জগন্নাথ” ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে নগরীর প্রধান সড়ক। ভক্তদের বিশ্বাস, রথের রশি স্পর্শ করা কিংবা রথ টানার সুযোগ পাওয়া পরম সৌভাগ্যের। তাই নারী-পুরুষ, তরুণ-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সবাই ভক্তিভরে রথ টেনে অংশ নেন মহোৎসবে। রাস্তার দুই পাশে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষ শোভাযাত্রা উপভোগ করেন। অনেকেই মোবাইল ফোনে ধারণ করেন স্মরণীয় মুহূর্ত, আবার অনেকে ভক্তিভরে রথকে প্রণাম জানান। শোভাযাত্রায় অংশ নেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ কুমিল্লা জেলা, মহানগর ও আদর্শ সদর উপজেলা শাখার নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধি, শিক্ষার্থী, ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। ফলে রথযাত্রা পরিণত হয় এক সর্বজনীন সম্প্রীতির মিলনমেলায়। সন্ধ্যায় শ্রীশ্রী গুন্ডিচা মন্দিরে সন্ধ্যারতি ও ভজন-কীর্তন অনুষ্ঠিত হয়। পরে দক্ষিণ ঠাকুরপাড়ার শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণ গৌর-নিতাই মন্দিরে ‘শ্রীশ্রী জগন্নাথ লীলামৃত’ পাঠ, ভক্তিমূলক আলোচনা এবং মহাপ্রসাদ বিতরণের মাধ্যমে দিনব্যাপী আয়োজনের সমাপ্তি ঘটে।
আয়োজকরা জানান, রথযাত্রা উপলক্ষে আগামী ২৩ জুলাই বৃহস্পতিবার পর্যন্ত বিশেষ পূজার্চনা, ভোগ আরতি, মহাহরিনাম সংকীর্তন, ধর্মীয় আলোচনা, বৈদিক নাট্য পরিবেশনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং মহাপ্রসাদ বিতরণ অব্যাহত থাকবে। তাদের প্রত্যাশা, এই মহোৎসব ভক্তি, মানবিকতা, সামাজিক সম্প্রীতি ও বিশ্বশান্তির বার্তা আরও বিস্তৃতভাবে মানুষের মাঝে পৌঁছে দেবে।