
নিজস্ব প্রতিবেদক।।
মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষার মূল ভিত্তি হলো পড়া, লেখা ও বোঝার দক্ষতা গড়ে তোলা। তার মধ্যে পঠন দক্ষতা হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই দক্ষতার উপর ভিত্তি করেই শিক্ষার্থীরা পরবর্তী শ্রেণিতে অগ্রসর হয়। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে অনেকেই শতভাগ রিডিং বা পাঠদক্ষতা অর্জন করতে পারে না। এটি একটি উদ্বেগজনক বিষয়, যা শিক্ষাক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শতভাগ রিডিং পড়তে না পারার কারণসমূহকরোনাকালীন শিখন ঘাটতি: দীর্ঘ সময় স্কুল বন্ধ থাকায় অনেক শিক্ষার্থীর বেইজ দুর্বল হয়ে পড়েছে।পারিবারিক অসচেতনতা: অনেক বাড়িতে শিক্ষার পরিবেশ বা অভিভাবকদের তদারকির অভাব রয়েছে।পর্যাপ্ত পাঠ্য উপকরণের অভাব:অনেক স্কুলে প্রয়োজনীয় পাঠ্যবই, গল্পের বই কিংবা রিডিং ম্যাটেরিয়াল পর্যাপ্ত পরিমাণে থাকে না।
এতে শিক্ষার্থীরা নিয়মিত চর্চার সুযোগ পায় না।শিক্ষকের অভাব বা প্রশিক্ষণের ঘাটতি: অনেক স্কুলে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই আবার কিছুক্ষেত্রে শিক্ষকরা যথাযথ প্রশিক্ষিত না হওয়ায় শিশুর মনস্তত্ত্ব বুঝে তাদের পাঠ শেখাতে পারেন না। ফলে শিশুরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।পারিবারিক পরিবেশের প্রভাব:অনেক শিশুর পরিবারে শিক্ষার প্রতি আগ্রহ বা সময় না থাকার কারণে তারা বাসায় রিডিং চর্চা করতে পারে না।অহেতুক ভীতি: ইংরেজি বা কঠিন বাংলা যুক্তবর্ণের প্রতি শিশুদের মনে এক ধরনের ভয় কাজ করে।মনোযোগের অভাব ও স্মার্ট ডিভাইসের ব্যবহার:
বর্তমান প্রজন্ম অনেক সময় মোবাইল বা টিভি-নির্ভর হয়ে যাচ্ছে, যা পাঠে মনোযোগ কমিয়ে দেয়।ভাষাগত জটিলতা: অনেক শিক্ষার্থী মাতৃভাষা ও পাঠ্যভাষার ভিন্নতার কারণে বুঝতে পারে না, ফলে রিডিংয়ে পিছিয়ে পড়ে।জবাবদিহিতার অভাব: বিদ্যালয়ের SMC, AD-HOC committee, PTA, UPEO, AUPEDO, URC- Instructor ইত্যাদির সমন্বয় বৃদ্ধিকল্পে এবং পক্ষপাতিত্ব ও স্বজনপ্রীতি রোধকল্পে জবাবদিহিতার অভাব।অপ্রতুল শিক্ষা উপকরণ:
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শ্রেণি ও পাঠ ভিত্তিক পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণের অভাবে শিক্ষার্থীরা কঠিন বিষয়কে সহজে আয়ত্ত করতে পারেনা।শ্রমজীবী শিশু: অনেক দারিদ্র্য শ্রেণির অভিভাবকগণ নাম মাত্র শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়ে রেখে শ্রমিকদের সাথে মাঠে পাঠান টাকা উপার্জনের জন্য।
এতে লেখাপড়ায় অমনোযোগী হয়ে যায় সেই শিশুটি।বেড়াতে যাওয়ার প্রবনতা: অসচেতন অভিভাবকগণ তাদের সন্তানদেরকে শুক্র শনিবার বন্ধ ভেবে আত্মীয় স্বজনের বাড়ি পাঠায় ঘনঘন। তাই সাপ্তাহিক বাড়ির কাজ অসম্পূর্ণ থাকে।প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, প্রতিটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় থেকে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের বাংলা ও ইংরেজি সাবলীলভাবে পড়া নিশ্চিত করা বাধ্যতামূলক।
এই লক্ষ্য অর্জনে শিক্ষকদের প্রতিদিন অন্তত ৫ পৃষ্ঠা জোরে শব্দ করে রিডিং পড়ানোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।১০০% পঠন দক্ষতা অর্জনের জন্য কার্যকর কিছু কৌশলজোরে পড়া : প্রতিদিন অন্তত ৫ পৃষ্ঠা জোরে পড়তে হবে। এতে মুখের জড়তা কাটে এবং বানান ভুলের প্রবণতা কমে।
ধ্বনিভিত্তিক পদ্ধতি: শুধু মুখস্থ না করে বাংলা ও ইংরেজির ক্ষেত্রে বর্ণের সঠিক উচ্চারণ ও ধ্বনি শেখার ওপর জোর দিতে হবে। বিশেষ করে ইংরেজির ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি ম্যাজিকের মতো কাজ করে।নিয়মিত রিডিং কার্ড: জটিল বাক্যগুলো ভেঙে ছোট ছোট বাক্যে রিডিং কার্ড তৈরি করে অনুশীলন করা যেতে পারে।শিক্ষক ও অভিভাবকের তদারকি: বানান ও উচ্চারণে কোনো সমস্যা হলে তাৎক্ষণিকভাবে তা শুধরে দেওয়া এবং প্রতিদিনের পড়া বুঝিয়ে দেওয়া।ওয়ান টু ওয়ান কেয়ার : পুরো ক্লাসের সব শিক্ষার্থীকে একসাথে না দেখে, যারা একদমই পড়তে পারছে না তাদের একটি আলাদা তালিকা তৈরি করুন। প্রতিদিন অন্তত ১০-১৫ মিনিট তাদের জন্য অতিরিক্ত সময় বরাদ্দ রাখুন।
সহপাঠী শিক্ষা: ক্লাসের মেধাবী শিক্ষার্থীদের দিয়ে পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের সাহায্য করার একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলুন। শিশুরা অনেক সময় শিক্ষকের চেয়ে বন্ধুর কাছে সহজে শেখে।প্রগতি প্রমাণক রাখা: ক্লাসের কোন শিক্ষার্থী আগে কেমন ছিল এবং বর্তমানে তার উন্নতির হার কতটুকু, তার একটি লিখিত প্রতিবেদন রাখতে হবে। এটি কর্তৃপক্ষের কাছে শিক্ষকদের আন্তরিক প্রচেষ্টার প্রমাণ হিসেবেও কাজ করবে।সহায়ক শিক্ষা উপকরণ : পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ ‘রেমেডিয়াল প্যাকেজ’ বা সহায়ক শিক্ষা উপকরণের ব্যবস্থা করতে হবে।রিডিং কর্নার স্থাপন ও পাঠাগার উন্নয়ন: প্রতিটি বিদ্যালয়ে শিশুদের জন্য আকর্ষণীয় বইসমূহের রিডিং কর্নার গড়ে তুলতে হবে, যাতে তারা আগ্রহ নিয়ে বই পড়তে পারে।
শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ: শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিয়ে শিশুদের উপযোগী পদ্ধতিতে পাঠদানের কৌশল শেখাতে হবে।অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি: পরিবারে পড়ার পরিবেশ গড়ে তুলতে অভিভাবকদের উৎসাহিত করতে হবে। নিয়মিত শিশুরা বাসায় কি পড়ছে, তা খেয়াল রাখতে হবে। ই-লার্নিং ও অডিও-বুকের ব্যবহার বাড়াতে হবে।সহপাঠ কার্যক্রম বৃদ্ধি: পাঠ প্রতিযোগিতা, গল্প বলা, নাটক ইত্যাদির মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের রিডিংয়ে উৎসাহী করতে হবে।
শিক্ষকদের তৎপরতা বৃদ্ধি করতে হবে। মাল্টিমিডিয়া প্রজেক্টরের ব্যবহার বৃদ্ধি করতে হবে।পঠন দক্ষতা শিশুর জ্ঞান অর্জনের প্রথম ধাপ।পড়ার পাঁচটি মৌলিক উপাদান রয়েছে। যেমন : ১।ধ্বনি জ্ঞান / বর্ণজ্ঞান ২।শব্দ জ্ঞান ৩।বাক্য জ্ঞান ৪।পঠন সাবলীলতা ৫।বোধগম্যতা.। এগুলো প্রাক – প্রাথমিক থেকে দ্বিতীয় শ্রেণির মধ্যেই সমাপ্ত করা সম্ভব। আর এগুলো সম্ভব করতে পারলেই পঠন দক্ষতা অর্জন হবে।প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যদি শতভাগ পঠন দক্ষতা অর্জন করতে না পারে তবে ভবিষ্যৎ শিক্ষা জীবনে তারা বারবার হোঁচট খাবে। তাই সরকারের পাশাপাশি শিক্ষক, অভিভাবক ও সমাজকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে যাতে প্রতিটি শিশু পাঠে দক্ষ হয়ে একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে পারে।
লেখক
মাহমুদা জাহান
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা
ব্রাহ্মণপাড়া,কুমিল্লা।