
তাপস চন্দ্র সরকার, কুমিল্লা।।
বিশ্বভ্রাতৃত্ব, মানবকল্যাণ, আধ্যাত্মিক জাগরণ এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির মহান আদর্শকে ধারণ করে বর্ণাঢ্য আয়োজনের মধ্য দিয়ে উদযাপিত হয়েছে দ্য থিওসোফিক্যাল সোসাইটি কুমিল্লা লজের ১৩৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। “সত্যের চেয়ে উচ্চতর ধর্ম নেই”— এই চিরন্তন দর্শনকে সামনে রেখে আয়োজিত অনুষ্ঠানে বক্তারা মানবিক মূল্যবোধ, নৈতিক শিক্ষা, সহনশীলতা ও সামাজিক সম্প্রীতির গুরুত্ব তুলে ধরেন।বৃহস্পতিবার (৪ জুন ২০২৬) বিকেল ৫টায় কুমিল্লা ক্লাব মিলনায়তনের ৫ম তলায় অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সোসাইটির সদস্য, শুভানুধ্যায়ী, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার বিশিষ্টজন উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের সূচনা হয়। পরে অতিথিদের ফুলেল শুভেচ্ছা জানিয়ে আলোচনা পর্ব শুরু করা হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা মনিরুল হক চৌধুরী। তিনি তাঁর বক্তব্যে দ্য থিওসোফিক্যাল সোসাইটি কুমিল্লা লজের দীর্ঘ ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের প্রশংসা করে বলেন, “দীর্ঘ ১৩৮ বছর ধরে মানবকল্যাণ, ধর্মীয় সম্প্রীতি ও নৈতিক চেতনা বিকাশে কাজ করে যাওয়া এ সংগঠনটি মানবিক মূল্যবোধের এক গুরুত্বপূর্ণ ধারক ও বাহক।”
তিনি লজের বেদখলকৃত জমি ও সম্পত্তি উদ্ধারে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের আশ্বাস দেন। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে জরাজীর্ণ অবস্থায় থাকা ভবনটি দ্রুত সংস্কার করে ব্যবহার উপযোগী করার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন। এ সময় তিনি ঢাকা-কুমিল্লা সরাসরি রেললাইন স্থাপন এবং কুমিল্লা বিমানবন্দর পুনরায় চালুর দাবির প্রতিও সমর্থন জানিয়ে বলেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে কুমিল্লার অর্থনৈতিক ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।বিশেষ অতিথির বক্তব্যে দ্য থিওসোফিক্যাল সোসাইটির প্রেসিডেন্সিয়াল রিপ্রেজেনটেটিভ ফর বাংলাদেশ, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সুব্রত চৌধুরী বলেন, বর্তমান বিশ্বে ক্রমবর্ধমান সহিংসতা, বিভাজন ও অসহিষ্ণুতার প্রেক্ষাপটে থিওসোফিক্যাল সোসাইটির দর্শন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। তিনি বলেন, “জাতি, ধর্ম, বর্ণ ও ভাষার ভেদাভেদ ভুলে মানুষে মানুষে ভ্রাতৃত্ববোধ প্রতিষ্ঠাই এ সংগঠনের মূল লক্ষ্য।”
প্রধান বক্তা, ইউনাইটেড রিলিজিয়ন্স ইনিশিয়েটিভ (URI)-এর বাংলাদেশ প্রতিনিধি, বিশিষ্ট ধর্মতত্ত্ব গবেষক ও গ্রন্থকার ড. মোহাম্মদ আবদুল হাই বলেন, থিওসোফিক্যাল সোসাইটি মানবতার কল্যাণে জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও আধ্যাত্মিক চর্চার এক আন্তর্জাতিক আন্দোলন। তিনি বলেন, “সত্যের অনুসন্ধান, আত্মশুদ্ধি এবং মানবসেবার মধ্য দিয়েই প্রকৃত আধ্যাত্মিক উন্নয়ন সম্ভব।”অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য রাখেন কুমিল্লা বারের সিনিয়র এডভোকেট মো. গোলাম ফারুক, নজরুল গবেষক ড. আলী হোসেন চৌধুরী এবং আবৃত্তিশিল্পী কাজী মাহতাব সুমন। বক্তারা বলেন, বর্তমান সময়ে নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক বিভাজনের প্রেক্ষাপটে থিওসোফিক্যাল সোসাইটির আদর্শ নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। মানবিক মূল্যবোধ, সহনশীলতা ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে সমাজকে আলোকিত করতে এ ধরনের সংগঠনের কার্যক্রম আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।আলোচনা সভার আগে প্রধান অতিথি মনিরুল হক চৌধুরী ও বিশেষ অতিথি সুব্রত চৌধুরী দ্য থিওসোফিক্যাল সোসাইটি কুমিল্লা লজ পরিদর্শন করেন। এ সময় তারা লজের সার্বিক অবস্থা ঘুরে দেখেন এবং এর উন্নয়ন, সম্পত্তি সংরক্ষণ ও সাংগঠনিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের বিষয়ে বিভিন্ন দিকনির্দেশনা প্রদান করেন।
সভায় আয়োজকরা জানান, মানবকল্যাণ, বিশ্বভ্রাতৃত্ব, আধ্যাত্মিক উন্নয়ন এবং ধর্মীয় সম্প্রীতির আদর্শ প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে দ্য থিওসোফিক্যাল সোসাইটি গত ১৩৮ বছর ধরে বিশ্বব্যাপী কাজ করে যাচ্ছে। কুমিল্লা লজও দীর্ঘদিন ধরে এ আদর্শ বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।পরে এক মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচির সমাপ্তি হয়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত অতিথি ও সুধীজনরা দ্য থিওসোফিক্যাল সোসাইটি কুমিল্লা লজের উত্তরোত্তর সাফল্য ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।
মানবতার সেবা, সত্যের অনুসন্ধান এবং বিশ্বভ্রাতৃত্বের আদর্শে ১৩৮ বছরের গৌরবময় পথচলার এই আয়োজন ছিল মানবিক মূল্যবোধ, জ্ঞানচর্চা, সম্প্রীতি ও আধ্যাত্মিক চেতনার এক অনন্য মিলনমেলা।