
নিজস্ব প্রতিবেদক।।
কুমিল্লা মহানগরীর দুর্দশা পরিত্রাণে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছেন। তৎমধ্যে ওয়াসার কার্যক্রম কুমিল্লায় বাস্তবায়ন। এছাড়া এটি আধুনিক কুমিল্লা গড়ার লক্ষ্যে কুমিল্লা-০৬ আসনের সাংসদ মনিরুল হক চৌধুরী সিটি প্রশাসককে নিয়ে দফায় দফায় আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন। দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা, ভুল পরিকল্পনা এবং প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবাহে মানুষের হস্তক্ষেপের পরিণতি। এই শহর ছিল নদীনির্ভর, প্রাণবন্ত ও স্বাভাবিক জলচক্রের অংশ। পুরনো গোমতীতে নৌঘাট ছিল। নবাব ফারুকিদেরও নিজস্ব ঘাট ছিল। তাদের জমিদারি এলাকা মুরাদনগরে নদীপথেই যাতায়াত করতো। কান্দিরপাড় মনোহরপুর নবাববাড়ি শাকতলায় নৌকা ঘাট ছিল। আমরা নিজেরাই তৈরি করেছি এক স্থায়ী জলাবদ্ধতার নগরী। গোমতী নদী একসময় শুধু একটি নদী ছিল না এটি ছিল কুমিল্লা শহরের প্রাণপ্রবাহ। এর অসংখ্য শাখা-প্রশাখা ছিল। ঘুংঘুর, ঘুইঙ্গাজুড়ি, ডাকাতিয়া, সোনাইছড়ি, ক্ষীরোদা, আর্চি, আর্সি-নালিয়ার মতো অনেক শাখা নদী ছিল। সালদা-তিতাসের সাথেও গোমতীর সংযোগ ছিল। এসব নদী শাখা নদীর সংযোগ দিয়ে পানি প্রবাহিত হতো, সাথে বর্ষায় আসত পলি ও বালি। এই পলি জমে শহরের ভূমি ধীরে ধীরে উঁচু হতো, যা ছিল এক প্রাকৃতিক ভূমি-উন্নয়ন প্রক্রিয়া। শহরের ভৌগোলিক ভারসাম্য এভাবেই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রক্ষা পেত। কিন্তু গোমতী নদীতে বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে সেই স্বাভাবিক প্রবাহ হঠাৎ করেই থামিয়ে দেওয়া হয়। নদীর সাথে শহরের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পলি প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায় শহরের ভেতরে, অথচ শহরের বাইরে যেখানে এখনো নদী ও খালের প্রবাহ কিছুটা সচল সেখানে পলি জমে জমি উঁচু হচ্ছে। ফলে ধীরে ধীরে একটি বিপজ্জনক বৈষম্য তৈরি হয়: শহরের ভেতরের ভূমি নিচু, আর বাইরের এলাকা তুলনামূলক উঁচু। গোমতীর তলদেশ ক্রমান্বয়ে উঁচু হয়ে গেছে: হারিয়েছে পানি ধারণ ক্ষমতা। প্রায়শই পানি উপচে বা বাঁধ ভেঙ্গে লোকালয় তলিয়ে ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। আজ কুমিল্লার জলাবদ্ধতার মূল কারণগুলোর একটি। বৃষ্টির পানি বা আশপাশের প্রবাহিত পানি স্বাভাবিকভাবে শহর থেকে বের হতে পারে না। এর সাথে যুক্ত হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ন, ড্রেন খাল ভরাট ও দখল, ড্রেনেজ ব্যবস্থার অকার্যকারিতা যা পুরো সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। ফলে কুমিল্লা শহর আজ একটি “বদ্ধ পত্র” যেখানে পানি ঢোকে, কিন্তু বের হওয়ার পথ পায় না। কুমিল্লা মূলত ঘুইঙ্গাজুড়ি খালের ওপর নির্ভরশীল। এটি ছিল গোমতীর শাখা নদী। গোমতির সাথে সংযোগ খুইয়ে এদকসময়ের এই নদী এখন সরু ড্রেন। যা ডিসির বাংলো থেকে শুরু হয়ে দুটি ভাগে এগিয়ে শাসনগাছা ও নোয়াগাঁওয়ে রেললাইন অতিক্রম করেছে। এই রেললাইনের ব্রীজগুলো অপেক্ষাকৃত সরু ও তলদেশ উঁচু। ফলে পানির প্রবাহ এখানেই থমকে যায়। যেহেতু রেলওয়ের সাথে সিটি কর্পোরেশন বা স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয় নেই: এবং পানি নিষ্কাশনের ইস্যুটি রেলওয়ের সাথে সম্পৃক্ত নয় সেহেতু এই দুটি ব্রীজ পর্যাপ্ত গভীর ও চওড়া নয়। শহরের এই পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো এর স্বাস্থ্যঝুঁকি। দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা শুধু অবকাঠামোগত সমস্যা নয়; এটি জনস্বাস্থ্যের জন্য এক বড় হুমকি। জমে থাকা পানিতে আবর্জনা পঁচে সৃষ্টি হয় বিষাক্ত পরিবেশ, বাড়ে মশাবাহিত রোগ, পানিবাহিত সংক্রমণ, এমনকি ভবিষ্যতে মহামারীর আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। একটি শহর যখন নিজের পানি নিষ্কাশন করতে অক্ষম হয়ে পড়ে, তখন সেটি ধীরে ধীরে বসবাসের অযোগ্য হয়ে ওঠে। এই বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে একটি কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় প্রশ্ন সামনে আসে কুমিল্লা শহরকে কি আমরা আগের মতোই বাড়াতে থাকব, নাকি নতুন করে ভাবব? বাস্তবতা বলছে, এই শহরের ওপর অতিরিক্ত চাপ বাড়ানো আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত হতে পারে। নতুন নতুন উন্নয়ন প্রকল্প, ঘনবসতি, বাণিজ্যিক স্থাপনা এসব কেবল সমস্যাকে ত্বরান্বিত করবে। তাই এখনই সময় একটি বিকল্প ভাবনার। কুমিল্লার জলাবদ্ধতার দীর্ঘকালীন সমাধান ছাড়া নতুন যে কোনো প্রকল্প গ্রহণ আত্মঘাতী হবে।