
নিজস্ব প্রতিবেদক।।
কুমিল্লা মর্ডাণ স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুসরাত জাহান। নুসরাত জাহানের সাথে ফ্যাসিবাদী সরকারের সাবেক এমপি বাহার, তার মেয়ে সূচি ও নিহত আরফানুল হক রিফাতের এক নিষ্ঠ কর্মী ছিল। যার কারণে সিনিয়র শিক্ষকদের বাদ দিয়ে তাঁকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পান নুসরাত জাহান। যদিও তার কোন পূর্বে প্রশিক্ষণ কিংবা অভিজ্ঞতা ছিল না। রাজনৈতিক কারণে তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পান। দীর্ঘ আওযামীলীগ আমলে চাকুরী করার পর ৫ই আগষ্ট দেশের পটপরিবর্তন ও ফ্যাসিবাদী সরকার পালিয়ে যায়। পরবর্তী একটি রাজনৈতিক নেতার আশ্রয় নিয়ে পুনরায় ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেন। তার শিক্ষকতার আমলনামায় উঠে এসেছে, ফ্যাসিবাদী আওয়ামীলীগ ও ৫ আগষ্টের পর রাজনৈতিক প্রভাব, অনিয়ম, জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাত, ভর্তি বাণিজ্য, অর্থ লোপাট, কিশোর গ্যাং আশ্রয় প্রশ্রয়, বেপরোয়া আচরণসহ নানান অভিযোগ। এত এত অভিযোগের পরও তার বিরুদ্ধেও দৃশ্যমান কোন ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি খোদ জেলা প্রশাসক ও শিক্ষা অফিস। এই শিক্ষককের এসব অভিযোগ নিয়ে দ্বিতীয়বারের মত টানা অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে কুমিল্লার খবর ও দৈনিক বাংলার আলোড়ন। ওঠে আসে একের পর এক ভয়ংকর তথ্য। অভিযুক্ত সেই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের যদিও একটি পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর বিভিন্ন পত্রিকা তার পক্ষে প্রতিবাদ লিপি ছাপানো হয়। বর্তমানে দূর্ণীতি সহ স্কুলের শিক্ষা ব্যবস্থার মান ও কিশোর গ্যাং এর দৌরাত্ম বেড়ে গেছে। যা নিয়ে সাধারণ অভিভাবকরাও উদ্বেগ্ন।জানা যায়, ১৯৯৩ সালে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটি বছরের পর বছর ধরে জেলার অন্যতম সুনামধন্য বিদ্যাপীঠ হিসেবে পরিচিত হলেও অভিযোগকারীদের দাবি, বর্তমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের কর্মকান্ডে এই সুনাম মারাত্মকভাবে ক্ষুন্ন হচ্ছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, নুসরাত জাহান তার অনভিজ্ঞতা ও ক্ষমতার প্রভাব ব্যবহার করে বিদ্যালয়ে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী গড়ে তুলেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, কতিপয় খন্ডকালীন শিক্ষক, মোঃ আরিফুর রহমান, মোহাম্মদ আবু তাহের ও মোসা, নাজমা আক্তারকে দিয়ে তিনি বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করে ‘মব’ বা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে, ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখেন। সেই সঙ্গে আর্থিক অনিয়মেও জড়িয়ে পড়েন বলে দাবি অভিযোগকারীদের।লিখিত অভিযোগে বলা হয়, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুসরাত জাহান মোট ১২ লক্ষ ২ হাজার ২৭ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এতে বিভিন্ন বরাদ্দ, রেজিস্ট্রেশন ফি, পরীক্ষার খরচ ও জমা-বিনিয়োগের অসঙ্গতি বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রাক-নির্বাচনী ও অর্ধ-বার্ষিক পরীক্ষার জন্য বরাদ্দ ২২ লক্ষ ৪৮ হাজার ৩২৬ টাকার মধ্যে ১৭ লক্ষ ৫০ হাজার ৩৭৬ টাকা পরীক্ষার সম্মানী হিসেবে বিতরণ করা হয় এবং অনুপস্থিত প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষকের জন্য ব্যয় হয় ৬৫ হাজার টাকা। কিন্তু অবশিষ্ট ৪ লক্ষ ৩২ হাজার ৯৫০ টাকার কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। এছাড়া বিভিন্ন শ্রেণির রেজিস্ট্রেশন ফি থেকেও বিপুল পরিমাণ অর্থের গরমিল পাওয়া গেছে বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন। ২০২৪ সালের ষষ্ঠ শ্রেণির রেজিস্ট্রেশন ফি থেকে উত্তোলিত ১ লক্ষ ৩৪ হাজার ৬৪০ টাকার মধ্যে ব্যাংকে জমা হয় মাত্র ৮৩ হাজার ২৮ টাকা। অবশিষ্ট ৫১ হাজার ৬১২ টাকার কোনো হদিস নেই। একইভাবে অষ্টম শ্রেণির রেজিস্ট্রেশন ফি বাবদ উত্তোলিত ৩ লক্ষ ২৫ হাজার ১৬০ টাকার মধ্যে জমা হয়েছে মাত্র ১ লক্ষ ৪৬ হাজার ৬২২ টাকা; যার বাকি ১ লক্ষ ৭৮ হাজার ৫৩৮ টাকার মধ্যে কম্পিউটার অপারেটরের নামে ধরা ২৬ হাজার ৫০০ টাকা বাদ দিলে বাকি টাকার উৎস বা ব্যবহার সম্পর্কে কোনো তথ্য নেই। নবম শ্রেণির ক্ষেত্রেও একই চিত্র। ৫ লক্ষ ৭৬ হাজার ৮০০ টাকার মধ্যে ব্যাংকে জমা হয়েছে শুধু ৪ লক্ষ ৪১ হাজার ২৫২ টাকা।২০২৫ সালে বিভিন্ন শ্রেণীর রেজিস্ট্রেশন ফি নিয়ে আরও অসঙ্গতির কথা উল্লেখ রয়েছে অভিযোগে। ষষ্ঠ শ্রেণির রেজিস্ট্রেশন বাবদ উত্তোলিত ২ লক্ষ ৪৩ হাজার ১০০ টাকার মধ্যে ব্যাংকে জমা হয় ২ লক্ষ ২ হাজার ২১৫ টাকা। অবশিষ্ট টাকার মধ্যে ২০ হাজার টাকা শ্রেণি শিক্ষক ও কম্পিউটার অপারেটরকে দেওয়া হলেও বাকি ২০ হাজার ৮৮৫ টাকার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। একই বছর অষ্টম শ্রেণির রেজিস্ট্রেশন বাবদ ৩ লক্ষ ৭৬ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে ব্যাংকে জমা হয় ৩ লক্ষ ৩ হাজার ৬ টাকা, আর শ্রেণি শিক্ষক ও অপারেটরকে দেওয়া ২০ হাজার টাকা বাদে বাকি ৫৩ হাজার ৪৯৪ টাকারও কোনো খোঁজ নেই।বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক মফিজুর রহমান নিজামী বলেন, কুমিল্লা মডার্ন হাই স্কুলের মতো প্রতিষ্ঠানে এমন দুর্নীতি বহুদিন ধরে চলছে। আমরা বহুবার অডিট করার কথা বলেছি, কিন্তু ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আমাদের কথা গুরুত্ব দেন না। আমরা এমপিওভুক্ত শিক্ষকরা প্রায় অকার্যকর হয়ে পড়েছি। উনি নন-এমপিও শিক্ষকদের দিয়ে সব কাজ করান। এতে বিদ্যালয় ধ্বংসের দিকে এগোচ্ছে।এছাড়াও, বিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষক নাম প্রকাশ না করার শর্তে এই প্রতিবেদককে বলেন, বিদ্যালয়ে অর্ধবার্ষিক ও প্রাক নির্বাচনী পরীক্ষার ফি বাবদ যে টাকাটা উঠেছে সে টাকার মূল খরচ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট টাকা তারা ভুয়া বিল ভাউচারের মাধ্যমে সমন্বয় করে আত্মসাৎ করে ফেলেছে। যে দুর্নীতি মুক্ত বাংলাদেশের জন্য শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করেছে সেই বাংলাদেশ সেই এখনো কিভাবে এমন দুর্নীতি থাকতে পারে। আমরা এর সঠিক তদন্ত সাপেক্ষে বিচার চাই। তবে, অভিযোগের বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুসরাত জাহানের কাছে মুঠোফোনে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। আমি সবগুলো অভিযোগের যথোপযুক্ত ব্যাখ্যা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) মহোদয়ের নিকট ব্যাখ্যা দিয়ে এসেছি এছাড়াও, জেলা প্রশাসক মহোদয় টাকাগুলো চাইলে আমি এখনই সেগুলো দিতে পারব। আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করে এমন অভিযোগগুলো তারা এনেছে। এ বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) সাইফুল আলম বলেন, “বিষয়টি আমার জানা নেই। অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা) এ বিষয়ে জানেন।” তবে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) আলী রাজিব মাহমুদ মিঠুনের সঙ্গে ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। এদিকে, এ ঘটনায় বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের মাঝে উত্তেজনা বিরাজ করছে। তারা আশা করছেন, কর্তৃপক্ষ দ্রুত তদন্ত করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।