বিশেষ প্রতিবেদন, কুমিল্লা।।
কুমিল্লায় খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই, ডাকাতি এবং কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে দিন দিন বেড়েই চলেছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নানামুখী তৎপরতা ও সমন্বিত উদ্যোগ সত্ত্বেও কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণে আসছে না অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। একের পর এক নেতিবাচক খবরে শিরোনাম হচ্ছে সারাদেশের গণমাধ্যম। এর ফলে জনমনে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বিগত সময়ের তুলনায় জেলায় অপরাধ দিন দিন বাড়ছেই। ২০২৫ সালে পুরো জেলায় ১০৩টি খুন ও ১৪৪টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছিল। আর চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর—এই ৯ মাসে জেলার ১৮টি থানায় মোট ৪,৯৬৩টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে—১১১টি খুন, ১৩৯টি ধর্ষণ, ২৩২টি নারী ও শিশু নির্যাতন, ১৪টি অপহরণ ও ৩৬টি ডাকাতির মামলা হয়েছে। এ ছাড়া দাঙ্গা, দস্যুতা, চুরি ও ছিনতাইয়ের মতো অপরাধও নিয়মিত ঘটছে। তবে পুলিশের দাবি, প্রতিটি ঘটনার রহস্য ইতোমধ্যে উন্মোচন করা হয়েছে। চলতি বছরের মাসভিত্তিক অপরাধ পর্যালোচনায় দেখা যায়, এপ্রিলে অপরাধের সংখ্যা ছিল ৫৮৪টি (যার মধ্যে আলোচিত ছিল কাস্টমস কর্মকর্তা বুলেট বৈরাগী হত্যা)। ২৫ এপ্রিল রাতে চট্টগ্রাম থেকে বাসে এসে মহাসড়কের কুমিল্লার ঝাগুরঝুলি এলাকায় নামার পরপরই ছিনতাইকারীদের হাতে খুন হন তিনি। এ ঘটনায় পুলিশ চারজনকে গ্রেফতার করে। এরপর মে মাসে সর্বোচ্চ ১৭টি খুনসহ ৬১২টি অপরাধ সংঘটিত হয়। আগস্ট মাসে খুনের সংখ্যা ছিল ১১টি। এর মধ্যে ৭ আগস্ট দেবিদ্বারে ফরিদা ইয়াসমিন নামের এক বৃদ্ধাকে হত্যার পর লাশ টুকরো টুকরো করে বিভিন্ন স্থানে ফেলে দেওয়া হয়। সেপ্টেম্বর মাসে ১৬ খুন ও ৩৪টি নারী-শিশু নির্যাতনসহ ৬৮১টি অপরাধ ঘটে। এ মাসে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র ছেলে ও সপ্তম শ্রেণির ছাত্র ইশায়াত শাহরিয়ার অপ্রতিমকে আইফোনের জন্য হত্যা করে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যরা। ১৯ সেপ্টেম্বর নিখোঁজের পর দিন লালমাই পাহাড়ের জঙ্গল থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। সর্বশেষ গত ৪ অক্টোবর রেসকোর্স এলাকার বাসা থেকে বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার কথা বলে বের হয়ে নিখোঁজ হয় সপ্তম শ্রেণির ছাত্রী তাজমিন। ৮ অক্টোবর লালমাই উপজেলার জগতপুর গ্রামের ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এ ঘটনায় গ্রেফতার সিএনজির চালক সুমন মিয়া আদালতে জবানবন্দি দিয়ে ধর্ষণের পর হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। এ ছাড়া গত ১৬ অক্টোবর (শুক্রবার) গোমতী নদীর পাড়ে যুবদল নেতা আবু কাউসারকে কুপিয়ে হত্যা করে দুষ্কৃতকারীরা। শুধু খুন-ধর্ষণ নয়, শিশু-কিশোরদের মোবাইল আসক্তি ও সামাজিক অবক্ষয়ের চিত্রও শঙ্কার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সম্প্রতি পুলিশ লাইন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চার ছাত্রী টিকটকে আসক্ত হয়ে নিরুদ্দেশ হয় এবং পরের দিন হবিগঞ্জ থেকে তাদের উদ্ধার করা হয়। মানবাধিকারকর্মী ও মানবাধিকার অধিকারের চেয়ারম্যান মওদুদ আবদুল্লাহ শুভ্র বলেন, কিশোর-কিশোরীরা অল্প বয়সে স্মার্টফোনে আসক্ত হয়ে টিকটক, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ফ্যান্টাসিতে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ছে, যার ফলশ্রুতিতে এসব অপরাধমূলক ঘটনা ঘটছে।সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) কুমিল্লার সভাপতি শাহ মো. আলমগীর খান বলেন, শুধু অভিযান চালিয়ে অপরাধ বন্ধ করা যাবে না। পারিবারিক ও নৈতিক শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দিতে হবে এবং সুন্দর সমাজ বিনির্মাণে সামাজিক ঐক্য গড়ে তুলতে হবে। বিচারিক দীর্ঘসূত্রিতা নিয়ে কুমিল্লা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নারী-শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল-১ এর পিপি মুহাম্মদ বদিউল আলম সুজন বলেন, ধর্ষণ মামলার তদন্তে ধীরগতি, তদন্ত কর্মকর্তা বদল, ডিএনএ প্রতিবেদন পেতে দেরি এবং সাক্ষীদের অনুপস্থিতির কারণে বিচার প্রক্রিয়া বিলম্বিত হয়, যা ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে বাধা সৃষ্টি করে। কুমিল্লা মেডিকেল কলেজের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. শারমিন সুলতানা জানান, অনেক সময় আলামত নষ্ট হওয়ার পর ভিকটিমকে হাসপাতালে আনা হয় এবং বস্ত্রসহ প্রয়োজনীয় আলামত সংরক্ষণ করা হয় না। ফলে ডিএনএ পরীক্ষায় অনেক সময় সঠিক ফল আসে না। এ বিষয়ে কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. লুৎফর রহমান জানান, হত্যা ও ধর্ষণসহ প্রতিটি ঘটনার রহস্য কম সময়ের মধ্যে উদ্ঘাটন করেছে পুলিশ। জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ, ডিবি ও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা মাঠে কাজ করছে। কিশোর গ্যাং ও মাদকের বিরুদ্ধে টানা অভিযানে দুই সহস্রাধিক মানুষকে আটক করা হয়েছে। নানামুখী অপরাধ নিয়ন্ত্রণে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
প্রকাশক ও সম্পাদক :
মোঃ সাইফুল ইসলাম ফয়সাল
cumillarkhobor33@gmail.com
Saifulcomilla24@gmail.com
01775726679