বিশেষ প্রতিবেদন।।
আমরা বা আমাদের পূর্বসূরিরা যখন ছাত্ররাজনীতি করত তখন ছাত্ররাজনীতি ছিল স্বপ্ন বিলাসী। তখন ছাত্রনেতারা ছিল শিক্ষিত, মার্জিত পরিশালিত -বুকভরা দেশপ্রেমের স্বপ্নে বিভোর একেকজন বিপ্লবী। ছাত্রনেতারা নবীন কর্মীদের শিখাতো দেশপ্রেম। তাদের হাতে তুলে দিতো বই - ক্লাস নিয়ে শিখানো হতো গণতন্ত্র কি, সমাজতন্ত্র কি -শিখানো হতো অর্থনীতির সংজ্ঞা কি - সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি বা পুঁজিবাদী অর্থনীতি বা মিশ্র অর্থনীতির সংজ্ঞা ও বিশ্লেষন। শিখানো হতো রাষ্ট্রের সংজ্ঞা , বিবর্তন ও সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা এবং বিশ্লেষণ। আমরা শিখেছি সামন্তবাদী সমাজ ও সাম্যবাদী সমাজের বিবর্তন ও সংজ্ঞা । শিখতাম মানব সভ্যতার বিবর্তন ও শ্রেনীবিভাজন। উদার গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থা কি আমরা শিখে নিতাম -
কৈশোরে নেতৃত্বের ইচ্ছে পুরণ করতে আগে প্রতিটি স্কুল কলেজে " কচি কাঁচার মেলা " বা " খেলাঘরের"মত সাংস্কৃতিক সংগঠন ও বিভিন্ন নামে ক্রীড়া সংগঠন তৈরি করে প্রগতিশীল কর্মী তৈরি করা হতো -শিখতাম প্রগতি, সংস্কৃতি, ধর্মনিরপেক্ষতার সংজ্ঞা । শিখতাম ধর্মনিরপেক্ষতার সাথে ধর্ম সাংঘর্ষিক কিনা। রাষ্ট্রের সাথে ধর্মনিরপেক্ষতার সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য। রাষ্ট্রের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতা কেন দরকার। জানতাম আধুনিক রাষ্ট্রের বিবর্তন -শিখতাম সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল, মার্ক্স, এঙ্গেলস, লেনিন, মাও'য়ের রাষ্ট্র দর্শন - জানতাম হযরত মুহাম্মদ( সাঃ) রাষ্ট্র দর্শন, মদিনা সনদের মাধ্যমে সকল ধর্মের লোক নিয়ে স্থিতিশীল রাষ্ট্র ব্যবস্থা। শিখতাম মৌলবাদ কি, সাম্প্রদায়িকতা কি? রাষ্ট্র কেন অনিবার্যভাবে সেকুলার। শিখতাম বিজ্ঞানী রুশোর রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা , ম্যাকিয়াভেলীর জাতীয়তাবাদ বা বিবর্তন - আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা । ছাত্রনেতারা শিখতেন নৃ-বিজ্ঞান, সমাজ বিজ্ঞান, প্রাণী বিজ্ঞান, সাহিত্য ও জ্ঞান বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে জানার চেষ্টা করতেন। ছাত্রনেতারা পড়তেন জানতেন আর পরিপূর্ণ মানুষ হয়ে দেশপ্রেমে উদ্ভুদ্ধ হতেন।একজন ছাত্র কর্মী সিনিয়র নেতাদের "ভাই" বলে সম্বোধন করতেন। সমাজের প্রতিটি মানুষের বিপদে এগিয়ে আসতেন নিঃস্বার্থভাবে - অন্যায়ের মোকাবেলা করতেন সাহসের সাথে - জীবনবাজি রেখে -বর্তমান ছাত্ররাজনীতি হাল ছিড়ে ফেলেছে। দিকহীন ভাবে চলছে তার অভিযাত্রা। শিক্ষা নেই, দীক্ষিত হতে চান না। ছাত্রনেতা মানেই একজন ক্ষমতাধর মানুষ -জনগন বন্ধু মনে না করে ভয় পায়। ছাত্রনেতা মানেই অনেকে হয়ে যান কন্ট্রাক্টর, চাঁদাবাজ, সন্ত্রাসী, মাস্তান। ছাত্রনেতাদের ভাই নয়, 'বস' বলে সম্বোধন করতে হয়!!আমাদের শিক্ষাজীবনে নতুনেরা ভর্তি হলে সংবর্ধনা দিয়ে বরণ করতাম - তাদের কাছে ছুটে যেতাম - তাদের সুখ-দুঃখের খবর নিতাম - দলীয় আদর্শের প্রতি অনুপ্রাণিত করতাম - ছোট ভাই বোনের মত আদর করতাম - এখন হয় রেগিং / র্যাগিং নির্যাতন - ছোটদের দাসের মত ব্যবহার করা হয় -রাজনৈতিকভাবে প্রশিক্ষিত হয়ে, লেখাপড়া করে নেতা হতে হয় না - নেতার বাসায় যে যত হাজিরা দিতে পারে সে-ই নেতা। বিভিন্ন কমিটি হয় টাকার বিনিময়ে অথবা নিজের লোক দেখে। কমিটিতে আসেন অশিক্ষিত, বিদেশ ফেরত, ব্যবসায়ী বা ঝরে পড়া ছাত্র, বিবাহিত, চাকুরীজীবি, মেম্বার, দোকানদার। একই ব্যক্তি একাধিক স্তরের কমিটিতে। শিক্ষার চর্চা নেই, সাহিত্যের চর্চা নেই, আদর্শের বালাই নেই। গুণ্ডামী, মাতলামি, সংঘটিত হয়ে মানুষের সেবা নয় মানুষকে ভয় দেখানো যেন তাদের কাজ।কর্মীদের শিক্ষিত করে দেশপ্রেমের মহান ব্রতে কি ভাবে ছাত্রদের উজ্জীবিত করবে ছাত্রনেতারা সেটা ভুলেই গেছে। নেশাখোর বা বিক্রেতারাও কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত হয় দেদারসে। ছাত্রনেতা হওয়ার আগেই চিন্তা করে ব্যবসার। যার ফলে হারিয়ে যাচ্ছে ছাত্ররাজনীতির ঐতিহ্য - ছাত্ররাজনীতি অভিভাবকদের কাছে হচ্ছে ঘৃণিত - জনগণের কাছে ছাত্ররাজনীতির আবেদন হারিয়ে যাচ্ছে - মেধাবী ছাত্ররা ছাত্ররাজনীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে।এ সুযোগ গুলো কাজে লাগাচ্ছে শিবিরের মত সাম্প্রদায়িক সংগঠন - তারা সারা বাংলাদেশে প্রতিটি হাইস্কুলের সাথে দূরত্ব আইন না মেনে কিন্ডারগার্টেন নামে স্কুল খুলেছে - বিভিন্ন মেডিকেল, নার্সিং কলেজ, টেকনিক্যাল স্কুল-কলেজ ও পাবলিক স্কুল-কলেজ গড়ে তুলেছে - প্রতিটি গ্রামে গড়ে তুলেছে অসংখ্য প্রতিষ্ঠান - বিশ্ববিদ্যালয়, বিভিন্ন কোচিং সেন্টার - নামে-বেনামে হরেক রকম প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে - টার্গেট করে তাদের কর্মীদের নিয়ে ওরা ওদের মতাদর্শের শিক্ষকদের সাথে আঁতাত করে গোপনে প্রশ্ন দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি করাচ্ছে - অন্যদের ঘাড়ে ভর করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ও প্রশাসনে পরিকল্পিতভাবে ওদের ট্রেনিং করা লোক নিয়োগ দিচ্ছে -টার্গেট করে হাইস্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা থেকে এরা ধর্মের নামে ট্রেনিং দিয়ে ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়িয়ে দিচ্ছে - ধর্মীয় উন্মাদনায় ও মিথ্যা প্রোপাগান্ডায় কচি মস্তিষ্ককে এরা ডাইভার্ট করে দিচ্ছে। বিভিন্ন আর্থিক সুযোগ দিয়ে ওদের অনুগত করার চেষ্টা করছে। প্রায় সকল ছাত্র সংগঠনের মুলনীতি প্রগতি -কিন্তু কয়জন ছাত্র নেতা প্রগতির সংজ্ঞা বা বিশ্লেষণ বুঝেন জানা নেই। রাজনীতি নিয়ে ডিবেট নাই, ক্লাস বা ট্রেনিং নাই, বুদ্ধিবৃত্তিক বা শিক্ষা-সংস্কৃতি ভিত্তিক রাজনীতির চর্চা নাই। এ ভাবে প্রগতিশীল ছাত্ররাজনীতি কালের স্রোতে হারিয়ে ফেলছে তার অতীত ঐতিহ্য ও উজ্জ্বলতা।সেটা এখনই উদ্ধার করা না গেলে জাতির জন্য এক মহাবিপর্যয় অপেক্ষা করছে -সর্বস্তরে মেধাবী ও অনুকরণীয় ছাত্র নেতাদের কাছে নেতৃত্ব দিতে হবে - প্রগতিশীল, যুক্তিনির্ভর বিজ্ঞান মনস্ক লেখাপড়ায় তাদের গড়ে তুলতে হবে - তাদের গড়ে তুলতে হবে সভ্য সংস্কৃতিবান মানুষ হিসাবে - নতুবা মানবিক দেশপ্রেমিক ভবিষ্যৎ নেতার জন্ম হবে না - বঙ্গবন্ধু সোনার বাংলা তৈরি করতে সোনার মানুষ চেয়েছেন, ছাত্রলীগই পারে সোনার মানুষ তৈরি করতে - ছাত্রনেতাদের ও জাতীয় নেতাদের এখনই প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে হবে নতুবা ইতিহাস অন্য রকম হবে আশাবাদী সকলে।
প্রকাশক ও সম্পাদক :
মোঃ সাইফুল ইসলাম ফয়সাল
cumillarkhobor33@gmail.com
Saifulcomilla24@gmail.com
01775726679