নিজস্ব প্রতিবেদক।।
কুমিল্লা জেলায় জুলাইয়ের তুলনায় আগস্টে সার্বিক অপরাধ ও মামলার সংখ্যা বেড়েছে। এক মাসে বিভিন্ন অপরাধে মামলা বেড়েছে ৭৬টি। জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় উপস্থাপিত কার্যপত্রের তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে জেলা পুলিশের আওতাধীন এলাকায় বিভিন্ন অপরাধে মোট ৫৮৫টি মামলা হয়েছে। জুলাইয়ে এ সংখ্যা ছিল ৫০৯টি।রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) কুমিল্লা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় এ তথ্য তুলে ধরা হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক রোজি আক্তার। সভা সঞ্চালনা করেন অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী। সভার শুরুতে তিনি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির মাসিক কার্যপত্র উপস্থাপন করেন।কার্যপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, আগস্টে খুন, চুরি, চাঁদাবাজি, মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত অপরাধ, আহতের ঘটনা, অস্ত্র উদ্ধার ও অপমৃত্যুর মামলা বেড়েছে। জুলাইয়ে কোনো মামলা না থাকলেও আগস্টে একটি অপহরণ মামলা হয়েছে। তবে একই সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও দস্যুতার মামলা কমেছে।জেলা পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, জুলাইয়ে খুনের মামলা হয়েছিল ১০টি। আগস্টে তা বেড়ে হয়েছে ১১টি। চুরির মামলা ৩১টি থেকে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫টিতে। জুলাইয়ে চাঁদাবাজির কোনো মামলা না থাকলেও আগস্টে দুটি মামলা হয়েছে।তবে অপরাধের পরিসংখ্যানে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন দেখা গেছে মাদকদ্রব্য সংক্রান্ত মামলায়। জুলাইয়ে এ ধরনের মামলা ছিল ২১১টি। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৮১টিতে। অর্থাৎ এক মাসে মাদক সংক্রান্ত মামলা বেড়েছে ৭০টি।এ ছাড়া জুলাইয়ে আহতের ঘটনা ছিল ১১২টি, আগস্টে তা বেড়ে হয়েছে ১১৩টি। অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা তিনটি থেকে বেড়ে ছয়টিতে দাঁড়িয়েছে। অপমৃত্যুর মামলাও বেড়েছে। জুলাইয়ে এ ধরনের ঘটনা ছিল ৪৭টি, আগস্টে তা বেড়ে হয়েছে ৬১টি। পাশাপাশি জুলাইয়ে কোনো অপহরণ মামলা না থাকলেও আগস্টে একটি মামলা নথিভুক্ত হয়েছে।অন্যদিকে কিছু অপরাধে আগস্টে কমতির চিত্রও রয়েছে। জুলাইয়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ছিল ৩০টি, আগস্টে তা কমে হয়েছে ২১টি। ধর্ষণের মামলা ২২টি থেকে কমে ১৭টিতে দাঁড়িয়েছে। দস্যুতার মামলাও জুলাইয়ের আটটি থেকে কমে আগস্টে হয়েছে সাতটি। ডাকাতির মামলা দুই মাসেই দুটি করে অপরিবর্তিত রয়েছে। দাঙ্গার ক্ষেত্রেও জুলাই ও আগস্টে কোনো মামলা হয়নি।সভায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির পাশাপাশি নগরীর বিভিন্ন নাগরিক সমস্যা নিয়েও আলোচনা হয়। মুক্ত আলোচনায় চুরি, ছিনতাই ও মাদক প্রতিরোধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা আরও জোরদারের দাবি ওঠে। একই সঙ্গে নদীর দুই পাড়ের আগাছা পরিষ্কার, নগরীর বিভিন্ন সড়কের খানাখন্দ সংস্কার এবং ডেঙ্গু প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয় মুক্ত আলোচনায় ওষুধ প্রশাসনের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন বক্তারা। বিশেষ করে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে চিকিৎসকদের ব্যবস্থাপত্রে দামি ও অনিবন্ধিত শ্যাম্পু ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে আলোচনা হয়। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়। এ ছাড়া কালেক্টরেট স্কুলে অধ্যক্ষ নিয়োগের বিষয়টিও সভায় আলোচিত হয়।মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন কুমিল্লা মডার্ন হাই স্কুলের সভাপতি নিজাম উদ্দিন কায়সার, দৈনিক কুমিল্লার জমিনের সম্পাদক শাহাজাদা এমরান, জেলা পরিবহন মালিক সমিতির সহসভাপতি জামিল আহমেদ খন্দকার এবং জাতীয় নাগরিক পার্টির কেন্দ্রীয় সদস্য নাভিদ নওরোজ শাহ।সভা শেষে সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক রোজি আক্তার বলেন, কুমিল্লার জনগণকে নিরাপদ ও ভেজালমুক্ত খাদ্য নিশ্চিত করতে জেলা নিরাপদ খাদ্য অফিস, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও বিএসটিআইকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে নিয়মিতভাবে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঠেকাতে বাজার মনিটরিং জোরদারের নির্দেশ দিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, বাজারে নিয়মিত তদারকি করতে হবে। প্রতিটি দোকানে দৃশ্যমান স্থানে পণ্যের মূল্যতালিকা রাখতে হবে, যাতে ক্রেতারা সহজেই নির্ধারিত দাম জানতে পারেন।লোডশেডিংয়ের সুযোগে ট্রান্সফরমার চুরি, রেলস্টেশনে ছিনতাই ও চুরিসহ বিভিন্ন অপরাধ দমনে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি। অপরাধীদের বিষয়ে তথ্য থাকলে তা গোপন রেখে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর জন্যও তিনি সাধারণ মানুষের প্রতি আহ্বান জানান।রেলওয়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আগের তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নের নির্দেশ দিয়ে জেলা প্রশাসক বলেন, কোনো সুপারিশ বাস্তবায়নে অর্থের প্রয়োজন হলে বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে লিখিতভাবে জানাতে হবে।মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ এবং নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে ওষুধ বিক্রির বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার নির্দেশ দেন রোজি আক্তার। এ ধরনের অনিয়মের বিষয়ে যারা অভিযোগ করবেন, তাদের তথ্য গোপন রাখা হবে বলেও তিনি জানান।মাদক নির্মূলে শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অভিযানই যথেষ্ট নয় উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, শিক্ষা ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাদকের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এসময়, সভায় জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম, ১০ বিজিবির অধিনায়ক মীর আলী এজাজ, সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী খন্দকার গোলাম মোস্তফাসহ জেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রধান ও বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
প্রকাশক ও সম্পাদক :
মোঃ সাইফুল ইসলাম ফয়সাল
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত