স্টাফ রিপোর্টার।।
প্রতিটি ভোর যেন নতুন একটি জীবনের আহ্বান। সূর্যের প্রথম সোনালি কিরণ যখন কুমিল্লার ঐতিহাসিক ধর্মসাগরের শান্ত জলে আলোর নকশা আঁকে, ঠিক তখনই ভেসে আসে একতারার টুংটাং সুর। ঢোলের তাল, হারমোনিয়ামের মূর্ছনা আর বাংলার মাটির গন্ধমাখা লোকগানের সুরে ধীরে ধীরে জেগে ওঠে চারপাশ। মনে হয়, শত বছরের ঐতিহ্য যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।ধর্মসাগর পাড়ের সুপ্রভাত মঞ্চ আজ শুধু একটি সাংস্কৃতিক আয়োজন নয়; এটি হয়ে উঠেছে সুস্থ জীবনচর্চা, মানবিক সম্প্রীতি, শিকড়ের প্রতি ভালোবাসা এবং বাংলা সংস্কৃতির এক অনন্য ঠিকানা। প্রতিদিন ভোরে এখানে মিলিত হন সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। কেউ হাঁটেন, কেউ ব্যায়াম করেন, কেউ ধ্যানমগ্ন হয়ে প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেন। আর ঠিক সেই সময়ই শুরু হয় বাংলার প্রাণের গান।এই সুরের আসরের প্রাণপুরুষ সুপ্রভাত মঞ্চের মুখপাত্র অধ্যক্ষ তাপস কুমার বকসী। তাঁর কণ্ঠে জারি, সারি, ভাটিয়ালি, ভান্ডারি ও লালন সংগীত যেন শুধু গান নয়, বাংলার হাজার বছরের ইতিহাস, মানুষের সুখ-দুঃখ, নদী, মাঠ, কৃষক আর গ্রামীণ জীবনের গল্প হয়ে উপস্থিত মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেয়। তাঁর কণ্ঠে যখন ভেসে ওঠে লালনের দর্শন কিংবা ভাটিয়ালির আকুল সুর, তখন অনেকেই কিছু সময়ের জন্য ভুলে যান জীবনের ব্যস্ততা, ক্লান্তি আর যান্ত্রিক নগরজীবনের চাপ। কেউ চোখ বন্ধ করে গান শোনেন, কেউ আবার অজান্তেই গুনগুন করে গেয়ে ওঠেন সেই সুরের সঙ্গে। এই আয়োজনকে আরও প্রাণবন্ত করে তোলেন অ্যাডভোকেট তাপস চন্দ্র সরকার। তাঁর হাতে ঢোল আর একতারা যেন কথা বলে। প্রতিটি তাল আর প্রতিটি ঝংকারে দর্শকদের হৃদস্পন্দন মিলেমিশে যায় বাংলার লোকঐতিহ্যের সঙ্গে। মনে হয়, বহুদিন পর শহরের বুকেও ফিরে এসেছে গ্রামের মেঠোপথের সেই চিরচেনা আবহ। হারমোনিয়াম ও কিবোর্ডে অনবদ্য সঙ্গত করেন কণ্ঠশিল্পী ভূষণ সূত্রধর। তাঁর সুরের মূর্ছনায় প্রতিটি গান হয়ে ওঠে আরও হৃদয়স্পর্শী। পাশাপাশি অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে পুরো আয়োজনকে সমৃদ্ধ করেন সুজন চন্দ্র সরকার, অধ্যক্ষ নিখিল চন্দ্র রায়, গৌতম চন্দ্র দাশ, নেপাল চন্দ্র দাশ, অধ্যাপক অনুকূল চন্দ্র দাশ এবং প্রফেসর মৃনাল কান্তি গোস্বামীসহ একদল সংস্কৃতিপ্রেমী মানুষ। তাঁদের সম্মিলিত প্রয়াসে প্রতিটি সকাল পরিণত হয় এক অনন্য সাংস্কৃতিক উৎসবে। শুধু গান নয়, এটি যেন মানুষে মানুষে ভালোবাসার বন্ধন গড়ে তোলার এক নীরব আন্দোলন। এখানে নেই কোনো রাজনৈতিক বিভাজন, নেই সামাজিক ভেদাভেদ। সবাই একসঙ্গে বসেন, গান শোনেন, গল্প করেন, হাসেন। পরিচয় একটাই—তারা সবাই বাংলার সংস্কৃতিকে ভালোবাসেন। ধর্মসাগরের এই মনোমুগ্ধকর আয়োজন এখন আর শুধু কুমিল্লার মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। প্রতিদিনের এই সুরেলা মুহূর্তগুলো নিজেদের ক্যামেরায় ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছেন কনটেন্ট ক্রিয়েটর সুমন চন্দ্র দেবনাথ, মোঃ সাইফুল ইসলাম এবং মোঃ এনামুল হক রুদ্র। তাঁদের নিষ্ঠা আর ভালোবাসার কারণে প্রতিদিন ভোরের এই অসাধারণ দৃশ্য এখন ছড়িয়ে পড়ছে দেশ-বিদেশে বসবাসরত অসংখ্য মানুষের কাছে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিওগুলো ইতোমধ্যেই ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। হাজার হাজার মানুষ ভিডিওগুলো দেখে মুগ্ধ হচ্ছেন, প্রশংসা করছেন এবং মন্তব্য করছেন—বাংলার সংস্কৃতি এখনও বেঁচে আছে, বেঁচে আছে মানুষের হৃদয়ে। প্রতিদিন সূর্য ওঠার আগেই ধর্মসাগর পাড়ে ভিড় করতে শুরু করেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, অধ্যাপক, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, ব্যাংকার, সরকারি কর্মকর্তা, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে প্রবীণ নাগরিক—সবাই যেন এখানে এসে খুঁজে পান নির্মল প্রশান্তি। কেউ দ্রুত হাঁটছেন, কেউ ব্যায়ামে ব্যস্ত। কেউ আবার বাদাম বিক্রি করে জীবিকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। হাঁটা শেষে কেউ ডায়াবেটিস কিংবা রক্তচাপ পরীক্ষা করছেন। কেউ বেঞ্চে বসে দূরের সবুজ গাছ আর শান্ত জলের দিকে তাকিয়ে প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যে হারিয়ে যাচ্ছেন। আবার কেউ ধর্মসাগরের টাটকা বিভিন্ন প্রজাতির মাছ কিনে বাড়ির পথ ধরছেন। সকালের এই প্রাণচাঞ্চল্য আরও পূর্ণতা পায় যখন অনেকেই হাঁটা শেষে কাছের হামসাফার রেস্টুরেন্ট কিংবা কুটুমবাড়িতে বসে একসঙ্গে নাস্তা করেন। গরম চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে চলে গল্প, হাসি আর জীবনের নানা অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি। যেন পুরো ধর্মসাগর পাড়টাই হয়ে ওঠে একটি বড় পরিবারের মিলনমেলা।প্রকৃতি, স্বাস্থ্যচর্চা, সংস্কৃতি ও মানবিক সম্পর্ক—এই চারটি বিষয়কে এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছে ধর্মসাগরের সুপ্রভাত মঞ্চ। এখানে প্রতিটি সকাল মানুষকে মনে করিয়ে দেয়—যে জাতি তার সংস্কৃতিকে ভালোবাসে, সে জাতি কখনো হারিয়ে যায় না।লোকসংগীতের প্রতিটি সুর যেন নতুন প্রজন্মকে শেকড়ের গল্প শোনায়। লালনের দর্শন শেখায় মানবতার পাঠ, ভাটিয়ালি মনে করিয়ে দেয় নদীমাতৃক বাংলার আত্মা, জারি ও সারি গান ফিরিয়ে আনে ঐতিহ্যের স্মৃতি। সেই সুরের সঙ্গে তাল মিলিয়ে ব্যায়াম করেন মানুষ, হাঁটেন মানুষ, বেঁচে থাকার নতুন শক্তি খুঁজে পান মানুষ।ধর্মসাগরের এই ভোর তাই শুধু একটি সকালের আয়োজন নয়—এটি কুমিল্লার আত্মপরিচয়, বাংলার সংস্কৃতির জীবন্ত প্রতিচ্ছবি এবং মানবিকতার এক অনন্য উৎসব।স্থানীয়দের প্রত্যাশা, এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হবে। নতুন প্রজন্ম লোকসংগীতের প্রতি আরও আকৃষ্ট হবে, সুস্থ জীবনচর্চার প্রতি আগ্রহী হবে এবং কুমিল্লার এই অনন্য সাংস্কৃতিক ভোর একদিন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বদরবারেও উদাহরণ হয়ে উঠবে।ধর্মসাগরের প্রতিটি ভোর যেন নীরবে বলে যায়—"যেখানে মানুষ গান গায়, সেখানে হৃদয় বেঁচে থাকে; যেখানে সংস্কৃতি বেঁচে থাকে, সেখানে বেঁচে থাকে একটি জাতির আত্মা।"
প্রকাশক ও সম্পাদক :
মোঃ সাইফুল ইসলাম ফয়সাল
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত