রকিবুল ইসলাম রানা(ম্যাক)।।
কুমিল্লা রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্মে আজও ছিলো মানুষের ভিড়। কেউ ট্রেন ধরার ব্যস্ততায় ছুটছে, কেউ আবার প্রিয়জনকে বিদায় জানিয়ে ফিরছে। সেই ব্যস্ততার মাঝেই হঠাৎ আমার চোখ আটকে যায় এক জটাচুল ধারী বৃদ্ধের দিকে। বয়স প্রায় ৭৫ বছর। পরনে মলিন পোশাক। হাতে একটি পুরোনো পত্রিকা। চারপাশের কোলাহল যেন তাকে স্পর্শই করছে না। গভীর মনোযোগে তিনি পত্রিকার পাতা উল্টে যাচ্ছেন। মনে হলো, পত্রিকাই যেন তার একমাত্র সঙ্গী, একমাত্র নেশা। কৌতূহলবশত আমি তার পাশে গিয়ে বসি। কথা বলতে চেষ্টা করি। জানতে চাই তার পরিচয়, তার জীবনের গল্প। কিন্তু তিনি কোনো উত্তর দেন না। শুধু চুপচাপ আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন, আবার কখনো পত্রিকার পাতায় চোখ রাখেন। আমি প্রশ্ন করতেই থাকি, আর তিনি নীরবে শুনতে থাকেন। অনেকক্ষণ পর যেন বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিয়ে তিনি কথা বলা শুরু করেন। আমার নাম আব্দুল বারেক, ধীর কণ্ঠে বললেন তিনি। বাড়ি দাউদকান্দিতে। এরপর ধীরে ধীরে খুলতে থাকে তার জীবনের এক বেদনাময় অধ্যায়। এক সময় তিনি ছিলেন একজন সরকারি কর্মকর্তা। ফেনীর আইডব্লিউও (IWO) অফিসে চাকরি করতেন। সম্মানজনক চাকরি, সুন্দর সংসার, সন্তানদের নিয়ে ছিল অনেক স্বপ্ন। জীবন তখন স্বাভাবিক ছন্দেই চলছিল। কিন্তু ১৯৯১ সালে সবকিছু বদলে যায়। চাকরি হারান তিনিও । কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই একদিন বন্ধ হয়ে যায় জীবিকার পথ। সংসারের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ধীরে ধীরে অনিশ্চয়তার দিকে এগোতে থাকে। চাকরি হারানোর কষ্ট তখনও পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। এরই মধ্যে জীবনে নেমে আসে আরও ভয়াবহ অন্ধকার। এক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে তিনি হারিয়ে ফেলেন তার পুরো পরিবার। তার তিন ছেলে, এক মেয়ে এবং পরিবারের অন্য সদস্যরা প্রাণ হারান। যে বাড়িতে একসময় সন্তানের হাসি-কান্নায় মুখর ছিল, সেই বাড়ি একদিন নিস্তব্ধ হয়ে যায়। কথাগুলো বলতে বলতে বারেক চাচার কণ্ঠ ভারী হয়ে আসে। চোখের কোণে জমে ওঠে অশ্রু। কিছুক্ষণ তিনি চুপ করে থাকেন। মনে হচ্ছিল, বহু বছর আগের সেই ক্ষত আজও রক্তক্ষরণ করে চলেছে। পরিবার হারানোর পর আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি তিনি। ধীরে ধীরে সবকিছু থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাথার চুল জট বেঁধে যায়, জীবনও জড়িয়ে যায় এক গভীর নিঃসঙ্গতায়। আজ রবিবার ২১শে জুন ২০২৬ইং কুমিল্লা রেলস্টেশনই যেন তার আশ্রয়। এখানেই কাটে দিনের বেশিরভাগ সময়। আর তার হাতে থাকে একটি পত্রিকা। দেশের খবর, মানুষের গল্প, সমাজের নানা ঘটনা এসব পড়েই হয়তো তিনি সময় কাটান। কিংবা হয়তো প্রতিটি পাতার ভাঁজে খুঁজে বেড়ান নিজের হারিয়ে যাওয়া জীবনের কোনো স্মৃতি। আমি যখন বিদায় নিচ্ছিলাম, তখন তিনি আবার পত্রিকার পাতায় চোখ রাখলেন। চারপাশে ট্রেনের হুইসেল বাজছিল, মানুষ ছুটছিল নিজ নিজ গন্তব্যে। কিন্তু আব্দুল বারেক চাচা বসে ছিলেন একই জায়গায় এক বুক স্মৃতি, অসীম বেদনা আর কিছু না বলা গল্প নিয়ে। কুমিল্লা রেলস্টেশনের হাজারো মানুষের ভিড়ে তিনি হয়তো একজন সাধারণ বৃদ্ধ। কিন্তু তার জীবনের গল্প আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কিছু মানুষ বেঁচে থাকেন শুধু জীবন নিয়ে নয়, বেঁচে থাকেন হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন, প্রিয়জনের স্মৃতি আর বুকভরা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে। পত্রিকার পাতায় মুখ গুঁজে থাকা এই বৃদ্ধ আসলে এক চলমান ইতিহাস, এক জীবন্ত বেদনার নাম আব্দুল বারেক।
প্রকাশক ও সম্পাদক :
মোঃ সাইফুল ইসলাম ফয়সাল
cumillarkhobor33@gmail.com
Saifulcomilla24@gmail.com
01775726679