নিজস্ব প্রতিবেদক।।
মানবতার সবচেয়ে সুন্দর রূপ হয়তো তখনই প্রকাশ পায়, যখন অভাবের মধ্যেও একজন মানুষ অন্য একজন বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ান। যশোরের এক ভূমিহীন, অসহায় নারী সম্প্রতি এমনই এক মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, যা স্পর্শ করেছে অসংখ্য মানুষের হৃদয়।নিজের কোনো জমিজমা নেই, নেই স্থায়ী কোনো বসতভিটা। সরকারের খাস জমিতে ছোট্ট একটি আশ্রয়ে বসবাস করেন তিনি। জীবিকা নির্বাহের একমাত্র উপায় ভিক্ষাবৃত্তি। প্রতিদিন মানুষের সহানুভূতির ওপর নির্ভর করেই চলে তাঁর জীবন। অথচ সেই তিনিই নিজের ভবিষ্যতের বিপদ-আপদের জন্য তিলে তিলে জমিয়ে রাখা অর্থ থেকে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও কলামিস্ট জেমস আব্দুর রহিম রানার চিকিৎসার জন্য ৩ হাজার ১০০ টাকা সহায়তা দিয়েছেন।
বর্তমানে ঢাকার জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র (নিটোর), অর্থাৎ ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন জেমস আব্দুর রহিম রানা। সম্প্রতি এক ভয়াবহ সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হওয়ার পর তাঁর ডান পা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে জটিল আঘাত লাগে। চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা, ওষুধ, থেরাপি ও পুনর্বাসনের প্রয়োজন হওয়ায় তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানবিক সহায়তার আবেদন জানান। জানা গেছে, ইতোমধ্যে তাঁর চিকিৎসার পেছনে প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয় হয়েছে। সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে আরও কয়েক লাখ টাকার প্রয়োজন হবে বলে চিকিৎসকরা জানিয়েছেন। এদিকে গত সোমবার দুপুরে যশোরের ওই অসহায় নারী তাঁর কষ্টার্জিত সঞ্চয় থেকে ৩ হাজার ১০০ টাকা সাংবাদিক রানার বিকাশ নম্বরে পাঠান। অনুদান পাওয়ার পর ধন্যবাদ জানাতে ফোন করলে সামনে আসে মানবতার এক অনন্য গল্প।
ফোনালাপে ওই নারী জানান, প্রায় তিন বছর আগে তিনিও একটি সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন। সেই দুর্ঘটনার পর কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। সংসারের হাল ধরার মতো কোনো উপায় না থাকায় শেষ পর্যন্ত ভিক্ষাবৃত্তিকেই জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হন। এরই মধ্যে হারিয়েছেন তাঁর জীবনসঙ্গীকেও। বর্তমানে সরকারের খাস জমিতে অতি কষ্টে দিন কাটাচ্ছেন তিনি।জানা যায়, ভবিষ্যতে কোনো অসুস্থতা কিংবা বিপদ-আপদে পড়লে কাজে লাগবে—এই চিন্তা থেকে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের দেওয়া সামান্য সামান্য অর্থ জমিয়ে ৩ হাজার ১০০ টাকা সঞ্চয় করেছিলেন তিনি। কিন্তু মানুষের মুখে মুখে সাংবাদিক জেমস আব্দুর রহিম রানার চিকিৎসা সহায়তার আবেদনের কথা শুনে তাঁর হৃদয় গলে যায়।সাংবাদিক রানার সঙ্গে তাঁর কখনো পরিচয় ছিল না, কোনো ব্যক্তিগত যোগাযোগও ছিল না। শুধু একজন আহত মানুষের অসহায় অবস্থার কথা শুনেই তিনি নিজের ভবিষ্যতের জন্য সঞ্চিত অর্থ তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। পরে পুরো ৩ হাজার ১০০ টাকা তিনি সাংবাদিক রানার বিকাশ নম্বরে পাঠিয়ে দেন।ঘটনাটি জানতে পেরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন জেমস আব্দুর রহিম রানা। তিনি বলেন, “আমার চিকিৎসার জন্য অনেকেই সহায়তা করেছেন। কিন্তু এই নারীর সহায়তা আমার হৃদয়কে সবচেয়ে বেশি স্পর্শ করেছে। যিনি নিজেই প্রতিদিন মানুষের সহানুভূতির ওপর নির্ভর করে বেঁচে আছেন, যাঁর নিজের জীবনই অভাব, বেদনা ও সংগ্রামের আরেক নাম, সেই মানুষটিই আমার জন্য তাঁর কষ্টার্জিত সঞ্চয় পাঠিয়েছেন। এই অর্থের মূল্য টাকার অঙ্কে মাপা সম্ভব নয়।”তিনি আরও বলেন, “এই নারী আমাকে শুধু অর্থ দেননি, নতুন করে বেঁচে থাকার সাহসও দিয়েছেন। তাঁর এই মানবিকতা আমাকে আবারও বিশ্বাস করতে শিখিয়েছে যে পৃথিবীতে এখনো ভালো মানুষ আছে, এখনো মানুষ মানুষের জন্য কাঁদে, ভালোবাসে এবং বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ায়।”ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর অসংখ্য মানুষ ওই নারীর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা প্রকাশ করেছেন। অনেকেই মন্তব্য করেছেন, সমাজে ধনীদের সংখ্যা হয়তো অনেক, কিন্তু এমন উদার হৃদয়ের মানুষ খুব কমই দেখা যায়। নিজের ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য সঞ্চয় করা অর্থ একজন অপরিচিত আহত মানুষের চিকিৎসার জন্য বিলিয়ে দেওয়ার ঘটনা নিঃসন্দেহে মানবতার এক বিরল উদাহরণ। বর্তমানে ঢাকা পঙ্গু হাসপাতালের গ্রীন-২ ইউনিটের ইএফ ওয়ার্ডের ২৮ নম্বর বেডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন সাংবাদিক জেমস আব্দুর রহিম রানা। তিনি দেশ-বিদেশে অবস্থানরত শুভানুধ্যায়ী, সহকর্মী, পাঠক এবং মানবিক হৃদয়ের মানুষের কাছে তাঁর দ্রুত সুস্থতার জন্য দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করেছেন। তিনি বলেন, “আর্থিক সহায়তার পাশাপাশি হাসপাতালে এসে কেউ খোঁজখবর নিলে, সাহস দিলে কিংবা দ্রুত সুস্থতার জন্য দোয়া করলে সেটিও আমার জন্য অনেক বড় প্রেরণা। মানুষের ভালোবাসাই আমাকে সুস্থ হয়ে ওঠার শক্তি জোগাচ্ছে।”
হাসপাতালে সাক্ষাৎ করতে চাইলে
জেমস আব্দুর রহিম রানা
গ্রীন-২ ইউনিট, ইএফ ওয়ার্ড
বেড নং–২৮
জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন কেন্দ্র(নিটোর) ঢাকা পঙ্গু হাসপাতাল, ঢাকা
মানবতার এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল—মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার সম্পদ নয়, তার হৃদয়। আর সেই হৃদয়ের মহত্ত্বই একজন ভূমিহীন, অসহায়, ভিক্ষাবৃত্তির ওপর নির্ভরশীল নারীকে অন্যের জীবন বাঁচানোর জন্য নিজের ভবিষ্যতের সঞ্চয়টুকুও নিঃসংকোচে বিলিয়ে দেওয়ার শক্তি দেয়।
প্রকাশক ও সম্পাদক :
মোঃ সাইফুল ইসলাম ফয়সাল
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত