নিজস্ব প্রতিবেদক।।
যৌথবাহিনীর ক্যাম্পে হামলা, ককটেল বিস্ফোরণ, সরকারি স্থাপনা ভাঙচুর, পাহাড় কেটে রাস্তা বিচ্ছিন্ন, বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা, ৪২ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত ২০০/৩০০ সন্ত্রাসী আসামী চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর যেন ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে ভয়ঙ্কর এক সশস্ত্র সন্ত্রাসী জনপদে। পাহাড় কাটা, সরকারি জমি দখল, অস্ত্রের মহড়া, ককটেল বিস্ফোরণ, চাঁদাবাজি, মাদক কারবার, দখলবাজি, অপহরণ, খুন, হামলা ও ভাঙচুরকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। এবার সেই সন্ত্রাসী নেটওয়ার্কের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে সীতাকুণ্ড মডেল থানায় দায়ের হওয়া বিশেষ ক্ষমতা আইনের একটি মামলায়। মামলার এজাহারে উঠে এসেছে কিভাবে শত শত সশস্ত্র সন্ত্রাসী গভীর রাতে সংঘবদ্ধ হয়ে যৌথবাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্প ও নির্মাণাধীন পুলিশ ক্যাম্পে হামলা চালায়, রাস্তা কেটে বিচ্ছিন্ন করে দেয় পুরো এলাকা এবং সরকারি স্থাপনায় ব্যাপক ভাঙচুর চালায়।
মামলাটি দায়ের করেন ফৌজদারহাট পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ পরিদর্শক মোঃ সোহেল রানা। সীতাকুণ্ড মডেল থানার মামলা নং ৫৫, তারিখ ২৬ মে ২০২৬। মামলায় বিশেষ ক্ষমতা আইন ১৯৭৪ এর ১৫(৩)/২৫(ঘ) ধারা এবং বিস্ফোরক দ্রব্য আইন ১৯০৮ এর ৩/৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলায় ৪২ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ২০০ থেকে ৩০০ জনকে আসামী করা হয়েছে। এজাহার সূত্রে জানা যায়, ২৪ মে দিবাগত রাতে জিডি মূলে সঙ্গীয় ফোর্সসহ জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় রাত্রীকালীন টহলে ছিল পুলিশ। রাত প্রায় ১১টা ৪৫ মিনিটের সময় গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশ জানতে পারে, জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসীরা স্কেভেটর ও ডাম্পার ট্রাক ব্যবহার করে রাস্তা কেটে যৌথবাহিনীর চলাচলে বাধা সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে তারা অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প ও আলী নগর উচ্চ বিদ্যালয়ে অবস্থানরত যৌথবাহিনীর সদস্যদের উপর হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। সংবাদ পাওয়ার পর উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে পুলিশ ঘটনাস্থলের দিকে অগ্রসর হয়। পথিমধ্যে ছিন্নমূল বাজার এলাকায় ডাম্পার ট্রাক দিয়ে রাস্তার উপর মাটি ফেলে ব্যারিকেড তৈরি করা অবস্থায় দেখতে পায় পুলিশ। পরবর্তীতে খেজুরতল এলাকায় গিয়ে দেখা যায় রাস্তার কালভার্ট স্কেভেটরের সাহায্যে কেটে ফেলা হয়েছে এবং ডাম্পার ট্রাকে করে মাটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। এতে পুরো এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি বেগতিক দেখে অফিসার ইনচার্জের নেতৃত্বে পুলিশ সদস্যরা পায়ে হেঁটে সামনে অগ্রসর হতে থাকেন। রাত প্রায় ১২টা ২০ মিনিটের সময় আলী নগর বাজার সিএনজি স্টেশনের সামনে পৌঁছালে দেখা যায় সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা স্কেভেটর ব্যবহার করে রাস্তার কালভার্ট কেটে ফেলছে এবং ডাম্পার ট্রাকের মাধ্যমে রাস্তা বিচ্ছিন্ন করছে। তখন পুলিশ বাঁশি, সিগন্যাল লাইট ও টর্চলাইটের মাধ্যমে তাদের থামানোর চেষ্টা করলে সন্ত্রাসীরা উল্টো আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে লক্ষ্য করে হামলা শুরু করে। এজাহারে উল্লেখ করা হয়, প্রতিহত করার চেষ্টাকালে বিবাদীরা ৪ থেকে ৫টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে পুরো এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি করে। পরে তারা আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি চালাতে থাকে এবং ইটপাটকেল নিক্ষেপ করে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে জানমাল ও সরকারি অস্ত্র রক্ষার্থে পুলিশ শর্টগানের ফাঁকা গুলি ছোড়ে। একপর্যায়ে সন্ত্রাসীরা আশপাশের পাহাড়ি গলিতে পালিয়ে যায়। এসময় ঘটনাস্থল থেকে মনির হোসেন (৩৪) নামে এক আসামীকে আটক করা হয়। তার কাছ থেকে একটি স্কেভেটর, একটি ডাম্পার ট্রাক, ১৫টি লাঠি, ককটেলের অংশবিশেষ এবং ৪টি ধারালো কিরিচ উদ্ধার করা হয়। কিন্তু সন্ত্রাসীদের তাণ্ডব থামেনি। রাত ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে সংবাদ আসে, সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা মাইকিং করে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি করছে এবং আলী নগর উচ্চ বিদ্যালয়ে অবস্থানরত যৌথবাহিনীর অস্থায়ী ক্যাম্পে হামলা চালিয়েছে। পরে পুলিশ ও যৌথবাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখতে পায়, সন্ত্রাসীরা স্কেভেটর দিয়ে বিদ্যালয়ের বাউন্ডারি ওয়াল ভেঙে ক্যাম্পে প্রবেশের চেষ্টা করছে। এসময় যৌথবাহিনী প্রথমে গ্যাসগান, পরে শর্টগানের রাবার কার্তুজ এবং চায়না রাইফেলের ফাঁকা গুলি নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালায়। কিন্তু সন্ত্রাসীরা পাল্টা গুলি, ককটেল বিস্ফোরণ ও ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকে। ভয়াবহ সংঘর্ষের একপর্যায়ে পুলিশ জামাল হোসেন (৫৩) ও দিদারুল আলম (৪০) নামে দুই আসামীকে আটক করতে সক্ষম হয়। তাদের কাছ থেকে আরও একটি স্কেভেটর, একটি ডাম্পার ট্রাক এবং শর্টগানের গুলির খোসা উদ্ধার করা হয়। এরপর রাত ২টার দিকে আরও ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। পুলিশ জানতে পারে, সশস্ত্র সন্ত্রাসীরা নির্মাণাধীন পুলিশ ক্যাম্পে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করছে। তারা স্কেভেটর ব্যবহার করে সরকারি স্থাপনার দেয়াল, টিন ও নির্মাণসামগ্রী ধ্বংস করছে। পরে পুলিশ ও যৌথবাহিনী সম্মিলিতভাবে ঘটনাস্থলে রওয়ানা হলে পাহাড়ের গহীন এলাকা থেকে সন্ত্রাসীরা ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে আবারও হামলা চালায়। মামলার বর্ণনায় বলা হয়, সন্ত্রাসীরা আগ্নেয়াস্ত্র, দা, কিরিচ, লাঠি ও ইটপাটকেল নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে হামলা চালাতে থাকে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে চায়না রাইফেলের ফাঁকা গুলি ছুড়তে বাধ্য হয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। পরে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যাওয়ার সময় বারেক হোসেন (২৪) ও সাইফুল কুদ্দুস (২২) নামে আরও দুইজনকে আটক করা হয়। ঘটনাস্থল থেকে জব্দ করা হয় তিনটি স্কেভেটর, তিনটি ডাম্পার ট্রাক, মাইকিং কাজে ব্যবহৃত সিএনজি, ককটেলের অংশবিশেষ, শর্টগানের গুলির খোসা, কিরিচ, লাঠি, ইটের টুকরো, ভাঙা টিন, জানালার গ্লাস, দরজার অংশ এবং সরকারি স্থাপনা ভাঙচুরের আলামত। এছাড়া ক্ষতিগ্রস্ত নির্মাণাধীন পুলিশ ক্যাম্পের চারটি স্থিরচিত্রও জব্দ করা হয়েছে। মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে বারেক হোসেন (২৪), সাইফুল কুদ্দুস (২২), জামাল হোসেন (৫৩), দিদারুল আলম (৪০) ও মনির হোসেন (৩৪)-কে। পাশাপাশি মামলায় নাম উল্লেখ করা হয়েছে বহু আলোচিত ও চিহ্নিত সন্ত্রাসীর। তাদের মধ্যে রয়েছে দস্যু শীর্ষ সন্ত্রাসী ইয়াছিন (৫৫), নূরুল হক ভান্ডারি (৫০), কালা ইয়াসিন ওরফে ক্যাডার ইয়াসিন (৩২), দেলোয়ার হোসাইন (২২), সোহেল (২৩), হাছান (৪৬), বার্মা সায়েম (৩০), ক্যাডার রাসেল (৩৬), খলিলুর (৩৮), ওমর ফারুক (৪৫), মোরশেদ (৪৮), নুর হোসেন (৩৫), কালা ফারুক (৪০), সালাউদ্দিন (৩১), শুকুর (৩০), আলম (৩৫), বেলাল (৪৪), জাহিদ (৩০), শাহ আলম টুটুল (৩২), শাহেদ আলী (৪৫), সাইফুল ইসলাম রবিন (৩৮), বোমা রাজু (৩০), ইসমাইল (২৮), বেদ্য মামুন (৪৪), শাহিন (৩৭), মিজানুর রহমান রাজু (৫১), মেজবাহ (৩০), শাহজাহান বাদশা ওরফে লাল বাদশা (৩৮), রাসেল (২৮), সবুজ (৩৫), দাতলা রাজু (২৬), সাকিব (২৭), হানিফ (৩৪) ও সাত্তার (৪০)। স্থানীয়দের অভিযোগ, জঙ্গল সলিমপুরকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে উঠেছে ভয়ঙ্কর অস্ত্রধারী সিন্ডিকেট। এসব চক্রের বিরুদ্ধে পাহাড় কাটা, দখলবাজি, অস্ত্র বাণিজ্য, অপহরণ,মাদক কারবার, খুন ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, লাল বাদশা, লুৎফর, ফারুক, ইয়াসিন, রাজু ও রোকন মেম্বার গ্রুপের সদস্যদের কাছে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র মজুদ রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে একে৪৭সহ ভয়ঙ্কর আগ্নেয়াস্ত্র রাখার অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব সন্ত্রাসী চক্র শুধু সীতাকুণ্ডেই সীমাবদ্ধ নয়। নগরীর আকবরশাহ, বায়েজিদ বোস্তামী, খুলসী ,হাটহাজারী, বাকলিয়া, চান্দগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় তাদের সক্রিয় ক্যাডার রয়েছে। তাদের কাজের মূল ক্ষেত্র হচ্ছে দখলবাজি, পাহাড় কাটা, ভূমিদস্যুতা, অস্ত্র বেচাকেনা এবং আধিপত্য বিস্তার। এলাকাবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চললেও শক্ত অবস্থান না থাকায় এসব গোষ্ঠী আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। সরকারি স্থাপনায় হামলা, যৌথবাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণ এবং ককটেল বিস্ফোরণের মতো ঘটনা প্রমাণ করে সন্ত্রাসীরা এখন রাষ্ট্রীয় বাহিনীকেও চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিচ্ছে।মামলার বাদী পুলিশ পরিদর্শক মোঃ সোহেল রানা এজাহারে উল্লেখ করেন, আসামীরা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার এবং অন্তর্ঘাতমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধ হয়ে ভয়ঙ্কর হামলা চালিয়েছে। তারা সরকারি সম্পদ ধ্বংস, রাস্তা বিচ্ছিন্ন, ককটেল বিস্ফোরণ ও সশস্ত্র হামলার মাধ্যমে বিশেষ ক্ষমতা আইন ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের গুরুতর অপরাধ করেছে। ঘটনার পর থেকে পুরো জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। যৌথবাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক টিম পলাতক আসামীদের ধরতে অভিযান চালাচ্ছে। প্রশাসনের উচ্চপর্যায় থেকেও ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানা গেছে।স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, জঙ্গল সলিমপুরকে ঘিরে গড়ে ওঠা সন্ত্রাস, দখলবাজি ও অস্ত্রের সাম্রাজ্য ভেঙে দিতে এখনই কঠোর ও স্থায়ী অভিযান প্রয়োজন। অন্যথায় ভবিষ্যতে আরও ভয়াবহ নাশকতা, প্রাণহানি ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
প্রকাশক ও সম্পাদক :
মোঃ সাইফুল ইসলাম ফয়সাল
© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত