পবিত্র ঈদুল আজহা মুসলিম উম্মাহর জন্য আত্মত্যাগ, আনুগত্য ও তাকওয়ার এক অনন্য শিক্ষা। কুরবানির প্রকৃত উদ্দেশ্য কেবল পশু জবাই নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিজের প্রবৃত্তি, অহংকার ও স্বার্থপরতাকে ত্যাগ করা। অথচ বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে কুরবানির মূল চেতনার চেয়ে আয়োজন, প্রদর্শনী কিংবা দায়িত্ব অন্যের ওপর ছেড়ে দেওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা যায়। এই বাস্তবতায় “নিজের কুরবানী নিজেই করুন”—এই আহ্বান কেবল আবেগ নয়; এটি সুন্নাহসম্মত ও আত্মশুদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ দাওয়াত।ইসলামের ইতিহাসে দেখা যায়, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজ হাতে কুরবানির পশু জবাই করতেন। হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) দুইটি শিংওয়ালা দুম্বা কু রবানি করেন এবং নিজ হাতে জবাই করার সময় “বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার” বলেন। সহিহ বুখারিতে এ বর্ণনা এসেছে। ফিকহবিদ ও ইসলামি গবেষকরাও উল্লেখ করেছেন, কুরবানিদাতার জন্য নিজ হাতে পশু জবাই করা উত্তম। যদি নিজে সক্ষম না হন, তাহলে অন্যকে দিয়ে জবাই করানো জায়েজ আছে; তবে জবাইয়ের সময় উপস্থিত থাকা মুস্তাহাব। আজকাল অনেকেই কুরবানিকে শুধুমাত্র “মাংস সংগ্রহের আয়োজন” মনে করেন। অথচ কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা হলো আল্লাহর আদেশের সামনে নিজেকে সমর্পণ করা। আল-কুরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন—“আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না তাদের গোশত ও রক্ত; বরং পৌঁছে তোমাদের তাকওয়া।”— সুরা হজ : ৩৭,নিজ হাতে কুরবানি করার মধ্যে এক ধরনের আত্মিক অনুভূতি রয়েছে। যখন একজন মুসলমান নিজের হাতে পশু জবাই করেন, তখন তিনি উপলব্ধি করতে পারেন—ত্যাগ ছাড়া ইবাদতের সৌন্দর্য পূর্ণ হয় না। এতে একদিকে সুন্নাহ পালন হয়, অন্যদিকে পরিবার ও নতুন প্রজন্মও কুরবানির প্রকৃত তাৎপর্য বুঝতে শেখে।তবে “নিজে কুরবানি করা” বলতে অপরিকল্পিত বা অদক্ষভাবে পশু জবাই করাকে বোঝানো হয়নি। শরিয়তের বিধান মেনে, পশুর প্রতি দয়া প্রদর্শন করে, ধারালো ছুরি ব্যবহার করে এবং নিরাপদ পরিবেশে জবাই করতে হবে। ইসলাম প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতা সমর্থন করে না; বরং কষ্ট কমানোর নির্দেশ দেয়।বর্তমান সময়ে অনেকে কসাইয়ের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল হয়ে পড়েছেন। এমনকি কেউ কেউ কুরবানির পশুর কাছেও যান না। এতে কুরবানির আধ্যাত্মিক অনুভূতি অনেকাংশে হারিয়ে যাচ্ছে। অথচ নিজের কুরবানির কাজে অংশ নেওয়া—পশু পরিচর্যা, জবাইয়ের সময় উপস্থিত থাকা, মাংস বণ্টন করা—এসবের মধ্যেই রয়েছে ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য ও সামাজিক সম্প্রীতির শিক্ষা।কুরবানি কেবল ধনীদের উৎসব নয়; এটি মানবিকতারও শিক্ষা। সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন যারা অভাবের কারণে কুরবানি দিতে পারেন না, আবার আত্মসম্মানের কারণে কারও কাছে হাতও পাতেন না। তাই কুরবানির মাংস বণ্টনের সময় আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও প্রকৃত অভাবীদের প্রতি বিশেষ খেয়াল রাখা ঈমানি দায়িত্ব।আমরা যদি কুরবানির প্রকৃত শিক্ষা হৃদয়ে ধারণ করি, তাহলে সমাজে ত্যাগ, সহমর্মিতা ও আল্লাহভীতির সংস্কৃতি গড়ে উঠবে। আসুন, কুরবানিকে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না রেখে সুন্নাহর আলোকে পালন করি। নিজের কুরবানী নিজেই করার মানসিকতা গড়ে তুলি—ইবাদতের স্বাদ অনুভব করি, সন্তানদেরও শেখাই কুরবানির প্রকৃত চেতনা।
তথ্যসূত্র:
সহিহ বুখারি, সুরা হজ (আয়াত ৩৭), ফিকহগ্রন্থ ও ইসলামি গবেষণা।
লেখক:
এইচ এম গোলাম কিবরিয়া রাকিব
প্রতিষ্ঠাতা: মাওলানা আবদুল হাকিম (রহ.) ফাউন্ডেশন, কুমিল্লা।
খতিব, প্রাবন্ধিক ও টিভি প্রোগ্রাম উপস্থাপক।
প্রকাশক ও সম্পাদক :
মোঃ সাইফুল ইসলাম ফয়সাল
cumillarkhobor33@gmail.com
Saifulcomilla24@gmail.com
01775726679