
গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির।।
মহান আল্লাহ তায়ালার রহমত ছাড়া মানুষ অসহায়। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর রহমত অপরিহার্য। জন্মের মুহূর্ত থেকেই মানুষ মহান আল্লাহর রহমতের ছায়ায় বেড়ে ওঠে। মায়ের স্নেহ, পিতার সুরক্ষা, সুস্থ দেহ, বোধশক্তি, খাদ্য ও বাসস্থান, সবই আল্লাহর রহমতের প্রকাশ। এগুলো না থাকলে জীবন অচল হয়ে যেত। ইবাদতের ক্ষেত্রেও রহমত ছাড়া উপায় নেই। মানুষ যত আমলই করুক, তা সীমিত ও ত্রুটিপূর্ণ। হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কেউ তার আমলের দ্বারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না।’ হযরত সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, আপনিও না? তিনি বললেন, ‘আমিও না. যতক্ষণ না আল্লাহ তার রহমত দ্বারা আমাকে আচ্ছাদিত করেন’ (সহিহ বুখারি)। এতে বোঝা যায়, চূড়ান্ত সফলতা আল্লাহর রহমতের ওপরই নির্ভরশীল। হাদিস শরিফের ভাষ্য অনুযায়ী রমজানের প্রথম দশ দিন রহমতের।গত ১৯ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) এর দ্বার খুলেছে। এই দিনগুলোতে মহান আল্লাহ বান্দাদের প্রতি অজস্র রহমত বর্ষণ করেন। আমাদের দায়িত্ব হলো, আল্লাহর অবারিত রহমতে নিজেকে সিক্ত করা। তাই রমজানে আল্লাহর রহমত লাভের চেষ্টা করা এবং অন্তরে তা অর্জন করার আশা রাখা ঈমানের দাবি।মহান আল্লাহর রহমতের আশা ও শাস্তির ভয় যখন সমান্তরাল হয়, তখন মুমিনের জীবনে ভারসাম্য আসে। তবে আলেমরা বলেন, মুমিন সবসময় আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ লাভের প্রবল আকাঙ্ক্ষা পোষণ করবে। কেননা আল্লাহর রহমত তার ক্রোধের চেয়ে প্রবল। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আমার দয়া সব বস্তুতে ব্যাপ্ত। সূতরাং আমি তা তাদের জন্য নির্ধারিত করব, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে, জাকাত দেয় এবং আমার নিদর্শনে বিশ্বাস করে’ (সূরা আরাফ ১৫৬)। মুমিন শুধু আল্লাহর কাছে পরকালীন জীবন নয় বরং পার্থিব জীবনেও আল্লাহর রহমত কামনা করে। কেননা উভয় জগতের কল্যাণ আল্লাহর হাতে। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘সেসব জনপদবাসী যদি ইমান আনত এবং আল্লাহকে ভয় করত তাহলে আমি অবশ্যই তাদের জন্য আকাশ ও জমিনের সমূহ বরকত উন্মুক্ত করে দিতাম। কিন্তু তারা অস্বীকার করেছে, তাই তাদের কৃতকর্মের কারণে আমি তাদের পাকড়াও করেছি’ (সূরা আরাফ ৯৩-৯৯)। মহান আল্লাহর রহমতের আশা ও শাস্তির ভয়ের ভেতর ভারসাম্য রক্ষা করা আবশ্যক। অন্যথায় মুমিনের জীবনে আমলের ভারসাম্য নষ্ট হবে।
হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা) বলেছেন, ‘বড় কবিরা গুনাহ হচ্ছে, আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা, আল্লাহর পাকড়াও থেকে নিশ্চিন্ত হয়ে যাওয়া এবং আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ে যাওয়া’ (মুসান্নাফে আবদুর রাজ্জাক) ।
আলোচ্য হাদিস শরিফে মহান আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়াকে যেমন গুনাহ বলা হয়েছে, তেমনি এর একটি সীমাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে। তা হলো, মুমিন আল্লাহর রহমত ও দয়ার ব্যাপারে এতটা আশা করবে না, যা তার ভেতর থেকে আল্লাহর শাস্তির ভয় দূর করে দেয়। আল্লামা আশরাফ আলী থানভি (রহ.) এমন অযাচিত আশাকে আত্মত্মপ্রবঞ্চনা বলেছেন। তিনি বলেন, আল্লাহর প্রতি মুমিনের আশা দুই প্রকার। এক. আল্লাহর রহমত লাভের আশা। দুই আত্মপ্রবঞ্চনা। মানুষ যদি তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব পালন করে, যথাযথ চেষ্টা করে এবং আমল করে, তবে মানুষ রহমতের আশা করতে পারে। আমল না করে শুধু আশার ওপর নির্ভর করা গুরুতর আত্মপ্রবঞ্চনা। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মানুষ। নিশ্চয়ই আল্লাহর প্রতিশ্রুতি সত্য। সুতরাং পার্থিব জীবন যেন তোমাদের কিছুতেই প্রতারিত না করে এবং সেই প্রবঞ্চক যেন কিছুতেই আল্লাহ সম্পর্কে তোমাদের প্রবঞ্চিত না করে’ (সুরা ফাতির ৫)। আল্লামা ইবনুল কাইয়িম জাওজি (রহ.) বলেছেন, যেসব হাদিসে আল্লাহর রহমতের আশা ও তার প্রতি ভালো ধারণা পোষণের শিক্ষা দেওয়া হয়েছে, তা মূলত আমল ও ইবাদতেরই তাগিদ স্বরূপ। কেননা আমল ও ইবাদতের মাধ্যমেই আল্লাহর রহমতের আশা ত্বরান্বিত হয়। রমজানে মানুষ মহান আল্লাহর রহমতের আশায় নেক আমল করে। নেক আমলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। যদিও রমজান আল্লাহর রহমত ও অনুগ্রহের মাস। তবু আল্লাহর রহমত রমজান মাসে সীমাবদ্ধ নয়, তাই রমজানে শুরু হওয়া নেক আমলগুলো ধরে রাখা আবশ্যক। কোনো ইবাদত শুরু করার পর তা ত্যাগ করা হতাশার প্রমাণ। এতে বোঝা যায়, বান্দা আল্লাহর রহমতের আশা ত্যাগ করেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন করতে নিষেধ করেছেন। আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রা.)-কে উদ্দেশ করে মহানবী (সা.) বলেন, ‘হে আবদুল্লাহ। তুমি অমুক ব্যক্তির মতো হয়ো না, সে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করত, অতঃপর তা ছেড়ে দিয়েছে। (সহিহ বুখারি)।
আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ লাভের ক্ষেত্রে একটি মূলনীতি হলো তাড়াহুড়া না করা এবং আল্লাহর নির্ধারিত সময়ের জন্য অপেক্ষা করা। নিম্নোক্ত হাদিস থেকে সেই শিক্ষাই লাভ করা যায়। হযরত খাব্বাব ইবনে আরাত (রা.) বলেন, ‘একবার আমরা রাসূল (সা.)-এর কাছে অভিযোগ করতে গেলাম। তিনি তখন কাবার ছায়ায় একটা চাদর মুড়ি দিয়ে বসে আছেন। আমরা বললাম, আপনি কি আমাদের জন্য সাহায্যের আবেদন করবেন না। আমাদের জন্য দোয়া করবেন না? তিনি বলেন, তোমাদের পূর্ববর্তী সময়ে দাওয়াতের কাজ করা লোকদের ধরে নিয়ে যাওয়া হতো। জমিনে গর্ত করে তাদের সেখানে রাখা হতো। লম্বা করাত দিয়ে তাদের মাথা দ্বিখণ্ডিত করা হতো। লোহার চিরুনি দিয়ে তাদেবা হাড্ডি থেকে গোশত আলাদা করা হতো। এমন বিভীষিকাময় শাস্তি পর্যন্ত তাদের দ্বীন থেকে ফেরাতে পারত না। আল্লাহর কসম! এ দ্বীন একদিন পূর্ণতা পাবেই। এমনকি একজন মুসাফির সানা শহর থেকে হাজরামাউত শহর পর্যন্ত নির্ভয়ে সফর করবে। কাউকে ভয় পাবে না। শুধু তার ছাগল পালের ওপর বাঘের ভয় করবে। অথচ তোমরা অস্থির হচ্ছ। তড়িঘড়ি করছ’ (সহিহ বুখারি)।