
এম এ কাদের অপু,লাকসাম-মনোহরগঞ্জ প্রতিনিধি।।
নির্বাচনী ময়দানে রেফারি যখন নিজেই আইন ভেঙে খেলোয়াড়কে ‘বিশেষ সুবিধা’ দেন, তখন সেই খেলার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
কুমিল্লা-৯ (লাকসাম-মনোহরগঞ্জ) আসনে ঠিক এমন একটি নজিরবিহীন কাণ্ড ঘটিয়েছেন স্থানীয় সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট। নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অকাট্য প্রমাণ পাওয়ার পরও অভিযুক্ত প্রার্থীকে আইনি দণ্ড না দিয়ে ‘ক্ষমা’ করে দিয়েছেন তিনি। প্রশাসনের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন ‘ব্যক্তিগত মহানুভবতা’ এখন টক অব দ্য কান্ট্রিতে পরিণত হয়েছে।আইন বনাম ম্যাজিস্ট্রেটের খেয়ালখুশিঃ
নির্বাচনী আচরণবিধির ৭(ঙ) ধারা অনুযায়ী রঙিন পোস্টার বা ফেস্টুন ব্যবহার করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এই অপরাধের শাস্তি হিসেবে বিধি ৩১ অনুযায়ী ৬ মাসের জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট এসিল্যান্ড তার ফেসবুক পেজে ঘটা করে ঘোষণা দিয়েছেন “ভুল স্বীকার করায় তাদের ১৮৭ ধারায় ক্ষমা করা হলো।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ‘মোবাইল কোর্ট আইন-২০০৯’ এর কোথাও কোনো ম্যাজিস্ট্রেটকে ‘ক্ষমা’ করার ইজারা দেওয়া হয়নি। আইনের ১০ নম্বর ধারায় স্পষ্ট বলা আছে, অভিযুক্ত ব্যক্তি দোষ স্বীকার করলে ম্যাজিস্ট্রেট তাকে ‘দণ্ড প্রদান করিবেন’। এখানে ‘ক্ষমা’ করার কোনো সুযোগ রাখা হয়নি। প্রশ্ন উঠেছে, একজন বিসিএস ক্যাডার কর্মকর্তা হয়েও তিনি কি প্রচলিত আইন জানেন না, নাকি জেনেও বিশেষ কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আইনের অপব্যাখ্যা করছেন?
১৮৭ ধারার অপপ্রয়োগ? সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ম্যাজিস্ট্রেট এখানে দণ্ডবিধির ১৮৭ ধারা ব্যবহার করেছেন। এই ধারাটি প্রয়োগ করা হয় তখনই, যখন কেউ সরকারি কর্মচারীকে দায়িত্ব পালনে সহায়তা করতে অস্বীকার করে। রঙিন পোস্টার লাগানোর সাথে এই ধারার কোনো সম্পর্ক নেই। সাংবাদিক ও আইন বিশ্লেষকদের মতে, অপ্রাসঙ্গিক একটি ধারা টেনে এনে মূল অপরাধকে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
যেসব প্রশ্ন এড়িয়ে যাচ্ছেন প্রশাসন: ১. অভিযুক্ত প্রার্থী যদি অন্য কোনো দলের হতো, তবে কি প্রশাসন সমান উদারতা দেখাত? ২. একজন বিচারক বা ম্যাজিস্ট্রেট কি প্রকাশ্য দিবালোকে আইনের বাইরে গিয়ে ‘ক্ষমা’ করার কোনো আইনি নথি দেখাতে পারবেন? ৩. ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম কি এখন থেকে ফেসবুক পেইজেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি তা যথাযথ আইনি রেজিস্টারে লিপিবদ্ধ করা হবে?
বিস্মিত স্থানীয় ভোটাররা: লাকসামের সাধারণ ভোটারদের মতে, প্রশাসনের এমন আচরণে অন্য প্রার্থীরা নিরুৎসাহিত হচ্ছেন। তারা বলছেন, যদি ভুল স্বীকার করলেই ক্ষমা পাওয়া যায়, তবে তো যে কেউ রঙিন ডিজিটাল ব্যানারে পুরো এলাকা ঢেকে দিতে পারে। পরে ম্যাজিস্ট্রেট ধরলে কেবল একটি ‘সরি’ বললেই কি মাফ পাওয়া যাবে? উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নীরবতা:
এই বিষয়ে জেলা প্রশাসক বা রিটার্নিং কর্মকর্তার সরাসরি কোনো পদক্ষেপ এখনও দৃশ্যমান হয়নি। তবে বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তীব্র সমালোচনা শুরু হওয়ায় বিব্রত অবস্থায় পড়েছেন স্থানীয় প্রশাসনের অনেক কর্মকর্তা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলেন, “ম্যাজিস্ট্রেটের ফেসবুক পোস্টটি প্রশাসনিক শিষ্টাচার ও আইন—উভয় দিক থেকেই ত্রুটিপূর্ণ।”আইনের চোখে ম্যাজিস্ট্রেট যা করতে পারতেন:
দণ্ড প্রদান: বিধি ৩১ অনুযায়ী নগদ অর্থদণ্ড বা জেল।
সতর্কীকরণ: এটি বিচারিক নথিতে রেকর্ড করে মৌখিকভাবে সতর্ক করা (কিন্তু ‘ক্ষমা’ নয়)।
বাজেয়াপ্তকরণ: অবৈধ প্রচারণা সামগ্রী ধ্বংস করা।
ঘটনার বিবরণ: সরেজমিনে দেখা যায়, লাকসাম উপজেলার কিছু এলাকায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর পক্ষে রঙিন ডিজিটাল ফেস্টুন দিয়ে প্রচারণা চালানো হচ্ছিল। যা ‘রাজনৈতিক দল ও প্রার্থী আচরণ বিধিমালা, ২০০৮’ এর বিধি ৭(ঙ) এর স্পষ্ট লঙ্ঘন। গতকাল ওই এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। অভিযানকালে রঙিন ফেস্টুনগুলো জব্দ করা হয়।
আইনের প্রয়োগ নিয়ে বিতর্ক: অভিযান শেষে সংশ্লিষ্ট এসিল্যান্ড তার দাপ্তরিক ফেসবুক পেজে এক পোস্টে উল্লেখ করেন, “রঙিন ফেস্টুন ব্যবহারের মাধ্যমে আচরণবিধি লঙ্ঘন করায় এবং পরবর্তীতে ভুল স্বীকার করায় তাদের দণ্ডবিধি, ১৮৬০ এর ১৮৭ ধারায় ক্ষমা করা হলো। তবে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন ভিন্ন কথা। ‘মোবাইল কোর্ট আইন, ২০০৯’ এর কোথাও ম্যাজিস্ট্রেটকে অপরাধীকে সরাসরি ‘ক্ষমা’ করার ক্ষমতা দেওয়া হয়নি। আইনের ১০ ধারা অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি যদি দোষ স্বীকার করেন, তবে ম্যাজিস্ট্রেট তাকে কেবল দণ্ড আরোপ করতে পারেন। দোষ স্বীকার না করলে নিয়মিত মামলায় পাঠাতে পারেন। কিন্তু ‘ক্ষমা’ করার কোনো আইনি ভিত্তি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেই।
ধারা নিয়ে বিভ্রান্তি: ম্যাজিস্ট্রেট তার পোস্টে দণ্ডবিধির ১৮৭ ধারার উল্লেখ করেছেন, যা মূলত সরকারি কর্মচারীকে সহায়তা না করার অপরাধে ব্যবহৃত হয়। অথচ রঙিন পোস্টারের অপরাধটি ছিল সরাসরি নির্বাচনী আচরণবিধির ৩১ নম্বর বিধির আওতাভুক্ত। কেন প্রাসঙ্গিক বিধি বাদ দিয়ে অপ্রাসঙ্গিক ১৮৭ ধারা ব্যবহার করে ‘ক্ষমা’ প্রদর্শন করা হলো, তা নিয়ে সচেতন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওই ম্যাজিস্ট্রেট মিলন চাকমা কোনো রিপ্লাই দেইনাই এবং তার ব্যবহারিত সরকারি নাম্বারে কল দিলেও তিনি রিসিভ করেন নাই। উপজেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা ও ইউএনও নার্গিস সুলতানাকে প্রশ্ন করেছিলাম ঠিক রাত ১১.৩০ মিনিটে। প্রশ্নটি ছিলো এইভাবেঃ স্যার, মোবাইল কোর্ট আইনের কোন ধারায় ‘ক্ষমা’ করার বিধান আছে বলে আপনি মনে করেন? জানান, বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে এবং নির্বাচনী আচরণবিধি বাস্তবায়নে প্রশাসন জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখবে।এসিল্যান্ডের পোস্ট করা ছবিতে মূলত দুটি আইনের ধারা এবং কিছু সুনির্দিষ্ট নির্দেশনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। নিচে সেগুলো বিস্তারিত দেওয়া হলো:
১. রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণ বিধিমালা, ২০০৮ (সংশোধিত ২০২৫) হয়েছে। এই