
গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির।।
ইসলাম ও ইনসাফ ভিত্তিক সমাজ এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচিত করা প্রতিটি বিবেকবান মানুষের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ, মানব সমাজের শান্তি – শৃঙ্খলা ও উন্নতির মূলভিত্তি হলো দায়িত্ববোধ ও যোগ্যতার মূল্যায়ন। যে সমাজে দায়িত্ব সঠিক হাতে ন্যস্ত হয়, সেখানে ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষ নিরাপদে, শান্তিতে বসবাস করতে পারে। বিপরীতে যখন দায়িত্ব অযোগ্যদের হাতে তুলে দেওয়া হয়, তখন সমাজে বিশৃঙ্খলা, অন্যায়, দুর্নীতি ও ধ্বংস নেমে আসে।রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই বাস্তবতাকেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন হাদিসে। তিনি বলেছেন, অনুপযুক্ত ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া কেয়ামতের আলামত।আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, একবার এক বেদুঈন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, কেয়ামত কখন সংঘটিত হবে? রাসুল সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন। আলোচনা শেষে তিনি বললেন, যখন আমানত নষ্ট করা হবে, তখন কেয়ামতের অপেক্ষা করবে। প্রশ্নকারী জানতে চাইল, কীভাবে আমানত নষ্ট করা হয়? রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উত্তরে বললেন, যখন কোনো অনুপযুক্ত ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়, তখন তুমি কেয়ামতের অপেক্ষা করবে। (সহিহ বুখারি)।এই হাদিস শুধু কেয়ামতের আলামত নয়, এটি মানব সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিতও বটে। এখানে আমানত বলতে বোঝানো হয়েছে দায়িত্ব, কর্তব্য, নৈতিকতা ও সামাজিক কর্তব্যের প্রতি সচেতনতা। মহান আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে মানুষকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে, তা সঠিকভাবে পালন করা এক প্রকার ইবাদত। কিন্তু যখন সমাজে অনুপযুক্ত ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হয় তখনই কেয়ামতের আলামত বলার অনেক সুযোগ আছে, যেমন,অন্যায়, অবিচার,জুলুম, আমানতের খিয়ানত, দাম্ভিকতা প্রকাশ, অনৈতিক কাজ, মিথ্যা, মাদকের ব্যাপক প্রচলন সহ নানা অপকর্ম বেড়ে যায়।
তারা দায়িত্বকে সেবার পরিবর্তে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে। ফলে প্রতিষ্ঠান দুর্বল হয়ে পড়ে, ন্যায়নীতি বিলুপ্ত হয়। এতে সাধারণ মানুষের জীবনে নেমে আসে অস্থিরতা।ইসলাম দায়িত্ব প্রদানের ক্ষেত্রে তিনটি নীতি শিক্ষা দিয়েছে, যোগ্যতা, আমানতদারিতা ও ন্যায়বিচার। কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদের আদেশ দিচ্ছেন আমানতসমূহ যার প্রাপ্য তার কাছে পৌঁছে দিতে।’ (সুরা নিসা ৫৮)। আয়াতই প্রমাণ করে, দায়িত্ব প্রদান গুরুত্বপূর্ণ আমানত।যোগ্যতার পরিবর্তে স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ বা স্বার্থের ভিত্তিতে দায়িত্ব বণ্টন করা হয়, তখন সেই আমানত নষ্ট হয়।আজকের বাস্তবতায় আমরা এই হাদিসের প্রতিফলন স্পষ্ট দেখতে পাই। রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব হোক, ধর্মীয় নেতৃত্ব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বা সামাজিক সংগঠন, সবখানেই অনেক সময় দায়িত্ব দেওয়া হয় এমন ব্যক্তিদের, যাদের নৈতিক বা যোগ্যতার কোনো ভিত্তি নেই।রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি দায়িত্ব নিয়ে তা সঠিকভাবে পালন করে, সে হবে জান্নাতের অধিবাসী। আর যে দায়িত্বে প্রতারণা করে, সে কেয়ামতের দিনে অপমানিত হবে।’ (সহিহ মুসলিম)। তাই দায়িত্ব বণ্টনে অবিচার শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং এটি ইমানের দুর্বলতারও প্রকাশ।যে সমাজে যোগ্যতা অবমূল্যায়িত হয়, সেখানে ন্যায়ের ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। সৎ মানুষ পিছিয়ে যায়, অযোগ্যরা অগ্রাধিকার পায়, আর নৈতিক মূল্যবোধ ধ্বংস হয়ে যায়। তখন কেয়ামতের আলামত ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, যেমনটি হাদিসে সতর্ক করা হয়েছে।সুতরাং, পরিবার থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনায় আমাদের সকলকে মহান আল্লাহ ও তাঁর প্রিয় হাবীব হুযূর পাক সাল্লাল্লাহু তায়ালা আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর নির্দেশিত পথে ও মতের ভিত্তিতে সৎ ও যোগ্য ব্যক্তিদের নির্বাচিত করার তাওফিক দান করুন, আমিন।।লেখক: গাজী মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম জাবির ধর্ম ও সমাজ সচেতন লেখক,গবেষক, ধর্মীয় অনুষ্ঠান উপস্থাপক ও চেয়ারম্যান, গাউছিয়া ইসলামিক মিশন, কুমিল্লা।